চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পার হলো ইউনূসের ৫৫৯ দিনের প্রশাসন

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি— টানা ৫৫৯ দিনের শাসনামল শেষে বিদায় নিচ্ছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে এই দীর্ঘ সময়ে সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত প্রশাসন ছিল নজিরবিহীন অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা আর ক্ষোভের কেন্দ্রে। পুরোটা সময়জুড়েই প্রশাসনে ছিল ক্ষোভ আর অনিয়মের ছড়াছড়ি। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রশাসনের এমন ‘হযবরল’ অবস্থা আর কখনও দেখা যায়নি। 

চেইন অব কমান্ডে ধস ও ‘মব’ কালচার

ইউনূস সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসনে দলীয় তকমা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন চরম আকার ধারণ করে। সচিবালয়ে প্রকাশ্যে কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, নাজেহাল করা এবং জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। মব সৃষ্টি করে ডিসি, ইউএনও এবং বিভাগীয় কমিশনারদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই সময়ে। পদ পেতে বিভিন্ন দাবিতে দফতর বন্ধ করে দিয়ে সচিবালয়সহ ডিসি ও ইউএনও অফিসের সামনে আন্দোলন করেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমনকি ডিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে সচিবালয়ে উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের হাতাহাতি করার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। 

দাবি-দাওয়া ও উপদেষ্টাদের অবরুদ্ধকরণ

মহার্ঘ ভাতা ও নতুন পে-স্কেলের দাবিতে পুরো সময়জুড়ে আন্দোলন করেছেন সরকারি কর্মচারীরা। সচিবালয়ে দাবি আদায়ের মুখে অর্থ উপদেষ্টাকে তার নিজ দফতরে মধ্যরাত পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। পরে পুলিশি পাহারায় তিনি মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের খসড়া সুপারিশ এবং বিভিন্ন ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এই প্রশাসনিক অস্থিরতাকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। 

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও ক্যাডার বৈষম্য 

প্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো প্রশাসনিক গতিশীলতা আনার বদলে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

আন্তঃক্যাডার বৈষম্য: ‘ক্যাডার যার মন্ত্রণালয় তার’— এই স্লোগানে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন ক্যাডার। বিসিএস (পরিসংখ্যান) ক্যাডারকে ‘অস্তিত্বহীন’ করার সুপারিশ এবং বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারের তিনটি গ্রুপকে একীভূত করার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে।

পেনশনভোগীদের অসন্তোষ: চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধিসহ ৩ দফা দাবিতে পেনশনভোগীরা পুরোটা সময় প্রশাসনকে চাপের মুখে রেখেছেন।

মহার্ঘ ভাতার দাবি: ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ৩০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার দাবি আদায় না হওয়ায় মাঠ প্রশাসনে স্থবিরতা দেখা দেয়।

পদোন্নতি ও নিয়োগে রেকর্ড বাতিল 

ইউনূস সরকারের গত ১৮ মাস বা ৫৫৯ দিনের শাসনামলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা, পদোন্নতি বঞ্চনা এবং একের পর এক নিয়োগ বাতিলের ঘটনায় প্রশাসনে চরম অস্থিরতা বিরাজ করেছে। সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত এই বিশৃঙ্খলা বজায় ছিল, যা সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

পদোন্নতি বঞ্চনা ও কর্মকর্তাদের ক্ষোভ

প্রশাসনে বর্তমানে অন্তত এক হাজার কর্মকর্তা পদোন্নতি না পাওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির জন্য নিয়মিত ২৪তম ব্যাচের ৩৩৭ জন এবং লেফট আউট ৪৩ জনসহ মোট ৫৭৪ জন যোগ্য কর্মকর্তা অপেক্ষায় আছেন। একইভাবে উপ-সচিব পদে পদোন্নতির জন্য ৩০তম ব্যাচ ও অন্যান্য ক্যাডারের ৫৪২ জন কর্মকর্তা অপেক্ষায় থাকলেও তাদের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব বঞ্চিত কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিনই জনপ্রশাসন সচিবের দফতর ঘেরাও ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। 

ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও নতুন বৈষম্য

কর্মরত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দিলেও ইউনূস সরকার ২০২৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ৭৬৪ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে উপ-সচিব থেকে সচিব পদ পর্যন্ত ‘ভূতাপেক্ষ’ পদোন্নতি প্রদান করে। আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত হওয়ার দাবিতে এই পদোন্নতি দেওয়া হলেও তা কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। সচিবালয়ের কর্মকর্তারা একে ‘আরেক ধাপের বৈষম্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা পুরো প্রশাসনকে কার্যত অকার্যকর করে ফেলে। 

শীর্ষ পদে রদবদল ও নিয়োগ বাতিলের রেকর্ড 

সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে একের পর এক নিয়োগ প্রদান ও তা বাতিলের ঘটনা। 

ডিসি নিয়োগ কেলেঙ্কারি: জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে এবং পরবর্তীতে ৯ জনের নিয়োগ বাতিল হয়। 

সচিব ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগ: বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যানকে নৌ-সচিব করার দুই দিন পর এবং ইলাহী দাদ খানকে খাদ্য সচিব করার মাত্র এক দিন পর নিয়োগ বাতিল করা হয়। এছাড়া পোল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ১০ দিন পরই তা বাতিল করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

পিএসসি বিতর্ক: চলতি বছরের ২ জানুয়ারি পিএসসির ৬ সদস্যকে নিয়োগ দিলেও বিতর্কের মুখে মাত্র ১১ দিনের মাথায় ১৩ জানুয়ারি তা বাতিল করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদ নিয়ে নাটকীয়তা

সরকারের বিদায়লগ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদ নিয়ে চরম নাটকীয়তা দেখা গেছে। বিদায়ী সচিব শেখ আব্দুর রশিদ পদত্যাগ করলেও সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে, যা তার সম্মানহানি করেছে বলে আলোচনা রয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মূখ্য সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনিও পদত্যাগ করেন। অবশেষে নতুন মন্ত্রিসভার শপথের ঠিক আগে স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনিকে চুক্তিভিক্তিক মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

পর্যবেক্ষণ 

প্রশাসনিক এই টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষ প্রশাসন খুবই জরুরি। ইউনূস সরকার শুরু থেকেই এ ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পুরো সময় জুড়েই তো প্রশাসনে অস্থিরতা কাজ করেছে বলে দেখলাম।” 

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ প্রশাসনিক অস্থিরতার অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।