দীর্ঘ দেড় যুগ পর মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও মনোজ্ঞ ফ্লাইপাস্ট। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানা যায়।
আইএসপিআর জানায়, কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের নির্দেশনায় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সশস্ত্র বাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ও সাভার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক। উপ-অধিনায়ক ছিলেন ৭১ মেকানাইজড ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাফকাত-উল-ইসলাম।
কুচকাওয়াজে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ২৫টি কন্টিনজেন্ট রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানায়। সম্মিলিত যান্ত্রিক বহরের অধিনায়ক ছিলেন নবম আর্টিলারি ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আনোয়ার উজ জামান। সুসজ্জিত বাহনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সালাম প্রদর্শনের পাশাপাশি আধুনিক সমরাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে আর্মি অ্যাভিয়েশন, নেভাল অ্যাভিয়েশন, বিজিবি এয়ার উইং ও র্যাব ফোর্সেসের ফ্লাইপাস্ট এবং প্যারা কমান্ডো সদস্যদের ফ্রিফল জাম্প দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বিমানবাহিনীর ফ্লাইপাস্ট ও অ্যারোবেটিক ডিসপ্লের নেতৃত্ব দেন এয়ার কমোডর মেহেদী হাসান।
নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে জাতীয় প্যারেড স্কয়ার ও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্বাধীনতা দিবসের চেতনা ধারণ করে ব্যানার ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। প্যারেড গ্রাউন্ডে বিভিন্ন বাহিনীর উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।
গণপূর্ত অধিদফতর, পিডিবি, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, টিঅ্যান্ডটি, ডেসকো, জনস্বাস্থ্য অধিদফতর, গণযোগাযোগ অধিদফতর এবং স্থাপত্য অধিদফতরের সহযোগিতায় আয়োজনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।
বাসস জানায়, সকাল ১০টার দিকে সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা। এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছান।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে খোলা জিপে তিনি প্যারেড পরিদর্শন করেন।
মার্চপাস্টে অংশ নেয় প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাজোয়া রেজিমেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট, আর্টিলারি, এয়ার ডিফেন্স, ইঞ্জিনিয়ার্স, সিগন্যালস ও সার্ভিসেস কন্টিনজেন্টসহ বিভিন্ন ইউনিট। পর্যায়ক্রমে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, এনসিসি, কারা পুলিশ, সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট ও আধুনিকায়িত ইনফ্যান্ট্রি ইউনিট রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানায়।
ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী কন্টিনজেন্টের পর খোলা গাড়িতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কন্টিনজেন্ট অগ্রসর হয়। এরপর প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় পতাকাসহ অবতরণ করেন।
এরপর শুরু হয় যান্ত্রিক বহরের প্রদর্শনী, যেখানে ট্যাংক, কামানসহ আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়।
কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিমানবাহিনীর অ্যারোবেটিক শো। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ প্রতিপাদ্যে যুদ্ধবিমান, প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টার বিভিন্ন ফরমেশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শন করে। পাঁচটি এফ-৭ যুদ্ধবিমান রঙিন ধোঁয়া ছড়িয়ে আকাশ প্রদক্ষিণ করে। পরে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্লাইং স্যালুট’ প্রদান করে এবং ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শনের মাধ্যমে আকাশে মিলিয়ে যায়।
সকাল ১১টা ৫৯ মিনিটে কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পরে রাষ্ট্রপতি অংশগ্রহণকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিদায় জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন তার কন্যা জাইমা রহমান। শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী হাজারো দর্শনার্থী জাতীয় পতাকা হাতে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
২০০৮ সালের পর ১৮ বছর বিরতির পর এবার স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় পুনরায় যুক্ত হলো এই বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে রমজানের শুরু থেকেই প্যারেড স্কয়ারে প্রস্তুতি শুরু হয় এবং চূড়ান্ত মহড়ার মাধ্যমে আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।