‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
রবিবার (২৯ মার্চ) জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য স্পিকারের কাছে কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধি অনুসারে তিনি এ মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দেন।
তবে জরুরি জনগুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্বে এই নিাটিশ দেওয়া বিধিসম্মত হয়নি বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্টমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। পরে নোটিশের ওপর আগামী ৩১ মার্চ অধিবেশনৈর দিন শেষ দুই ঘণ্টা আলোচনার জন্য নির্ধারণ করেন অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া প্রস্তাবটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো—
১) উত্থাপনীয় বিষয়
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে।
২) আলোচনা উত্থাপনের কারণ
(ক) জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের প্রদত্ত রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনে বর্ণিত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।
(খ) বিষয়টি মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা জনাব ডাঃ শফিকুর রহমান বিগত ১৫ মার্চ ২০২৬ ইং তারিখে সংসদে উত্থাপন করেন। মাননীয় স্পিকার এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রদান করার জন্য বলেন। মাননীয় স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধি অনুসারে উপরোল্লিখিত জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ প্রদান করছি। এমতাবস্থায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর প্রস্তাবনায় বর্ণিত পরিস্থিতি ও কারণ
উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। তা হচ্ছে— যেহেতু সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটিয়াছে; এবং
যেহেতু উক্ত গণঅভ্যুত্থানের ফলে ৫ আগস্ট ২০২৪ (২১ শ্রাবণ ১৪৩১) তারিখ তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে, ৬ আগস্ট ২০২৪ (২২ শ্রাবন ১৪৩১) তারিখে জাতীয় সংসদ ভাঙ্গিয়া দেওয়া হয় এবং ৮ আগস্ট ২০২৪ (২৪ শ্রাবণ ১৪১৩) তারিখে বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যাহা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকারিতা ও স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে; এবং
যেহেতু রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করিবার উদ্দেশ্যে অন্তবর্তীকালীন সরকার সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬ টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং উক্ত কমিশনসমূহ স্ব স্ব প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ করবেন; এবং
যেহেতু উপরিউক্ত প্রতিবেদনগুলিতে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশসমূহের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ (২৯ মাঘ ১৪৩২) তারিখে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে; এবং
যেহেতু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও জোটের সহিত আলোচনাক্রমে সংবিধান সংস্কারসহ অন্যান্য সংস্কারের সুপারিশ সংবলিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রণয়ন করে এবং রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে উক্ত সনদে স্বাক্ষর ও তাহা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে; এবং
যেহেতু সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন এবং তদুদ্দশ্যে গণভোট অনুষ্ঠান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও উক্ত পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার করার আবশ্যকতা রহিয়াছে; এবং
যেহেতু উপরে বর্ণিতমতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করিবার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা একান্ত প্রয়োজন;
সেহেতু ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে সংঘটিত ছাত্র জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরামর্শক্রমে, রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করেন।
(গ) বিগত ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখ সরকার গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রভাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য অধ্যাদেশটি জারি করা হয়।
(ঘ) বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে হ্যাঁ ভোট বিজয়ী হয়। জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ ও জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবের পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেন।
(ঙ) গণভোটে হ্যাঁ-ভোট নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ দুইটি শপথ (সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য) পাঠ করতে আইনানুগভাবে বাধ্য। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ্য সদস্যদের ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং তারিখে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান। উক্ত শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মাননীয় সংসদ সদস্যগণ সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ জোটের ৭৭ জন মাননীয় সংসদ সদস্য পৃথকভাবে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করেন।
(চ) জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ (ত্রিশ) পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বিধান থাকলেও এখনো পর্যন্ত তা করা হয়নি।
(ছ) জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরণের অচলাবস্থা সৃষ্টি করা কখনও কাম্য নয়। এমতাবস্থায় জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন সংক্রান্ত আলোচনার জন্য মাননীয় স্পিকারের প্রতি সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের আহ্বান করছি।