বিধি উপেক্ষা করে সংসদে কথা বলতে ফ্লোর পেতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় সংসদ অধিবেশনে। সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদীয় বিধি উপক্ষো করে কথা বলার সুযোগ চাইলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসময় স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
রবিবার (২৯ মার্চ) সংসদ অধিবেশনের মাগরিবের নামাজের বিরতির পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উত্থাপিত নোটিশকে ঘিরে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। তিনি জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান ও সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে একটি নোটিশ উপস্থাপন করেন। তারপর আইনমন্ত্রী অ্যাড. আসাদুজ্জামান বক্তব্য রাখেন। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করার জন্য বক্তব্য রাখেন। সেদিন সংবিধান, জুলাই সনদসহ প্রয়োজনী বই উপস্থিত রাখার জন্য বলেন।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন। তিনি বিরোধী দলের নেতার নোটিশটি সংশোধনের পরামর্শ দেন। এরই মধ্যে স্পিকার আগামী মঙ্গলবারের (৩১ মার্চ) কার্যক্রমের শেষ দুই ঘণ্টা নির্ধারণ করেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার কথা বলার জন্য ফ্লোর চাইলে ব্যাপক হট্টগোল দেখা যায়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ জোটের একাধিক সদংসদ সদস্যও এসময় কথা বলার জন্য দাঁড়িয়ে যান। সরকারদলীয় চিফ হুইপও ফ্লোরের দাবি জানান। ডেপুটি স্পিকার চিফফ হুইপকে ফ্লোর দিলে অধিবেশন কক্ষে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
হট্রগোলের মধ্যে বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা সরকারি দলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে নানা তীর্যক মন্তব্য করতে থাকেন। পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিরোধী জোটের একাধিক সংসদ সদস্য মাইক ছাড়াই বলতে থাকেন। বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা বলেন, এই সংসদ গায়ের জোরে চালানো হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। সরকারি দলের পক্ষ থেকে কর্তত্ব দেখানো হচ্ছে। এসময় স্বরাষ্ট্র্র ও আইনমন্ত্রীকে ব্যর্থ বলে চিৎকার করতে থাকেন সংসদ সদস্যরা।
জোটের সংসদ সদস্যরা আরও বলেন, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে কোনও রকম টালবাহানা চলবে না। সরকারি দলকে কেবল মাইক দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলকে মাইক দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। তারা বিরোধীদলীয় চিপ হুইপকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। এসময় সরকারি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য কথা বরার সুযোগ চান। পাশাপাশি বিরোধী জোটের বক্তব্যর প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
এসময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সংসদীয় বিধি অনুযায়ী সবাইকে কথা বলার অনুরোধ জানিয়েও ব্যর্থ হন। বিরোধী জোটের একাধিক সংসদ সদস্য কথা বলতে বারবার উঠে দাঁড়ান। বিরোধীদলীয় নেতা কথা বলার জন্য দাঁড়ালে তাকে ফ্লোর দেওয়া হয় কয়েকবার। নিয়ম অনুযায়িী বিরোধীদলীয় নেতা কথা বলার জন্য দাঁড়ালে জোটের অন্য কেউ দাঁড়ান না। কিন্তু রবিবার (২৯ মার্চ) সংসদ অধিবেশনে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়।
বিরোধীদলীয় নেতা তার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান শিরোনামের মূলতবি নোটিশে বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী— সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বিধান থাকলেও এখনো পর্যন্ত তা করা হয়নি। জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি করা কখনও কাম্য নয়। এমতাবস্থায় জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন সংক্রান্ত আলোচনার জন্য স্পিকারের প্রতি সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের আহ্বান করছি।”
এরপর ফ্লোর নিয়ে নোটিশটাই তো বৈধ হয় নাই বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ৬২ বিধিতে এই নোটিশ গ্রহণ করা হলে তা সংশোধিত আকারে গ্রহণ করতে হবে বলে তিনি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও অপেশাদারত্বের পরিচয় দিয়েছে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আনা মুলতবি প্রস্তাবটি দিতে গিয়ে ন্যূনতম ‘কার্যপ্রণালি বিধি’ অনুসরণ করা হয়নি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিধি ৬২-এর অধীনে যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, তার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত ছিল বিধি ৬৮-এর অধীনে।” মন্ত্রীর ভাষায়, “নোটিশটাই তো বৈধ হয়নি।”
একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে কোন বিধিতে কতক্ষণ আলোচনা করা যায় বা যায় না, তা নিয়ে সংসদের ভেতরেই হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। এমনকি বিধি ৬৩ অনুযায়ী, যা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধান করতে হয় তা যে মুলতবি প্রস্তাবের বিষয় হতে পারে না, সংসদীয় প্রথাটুকুও মানেননি বিরোধী দলের নীতিনির্ধারকরা।
এক পর্যায়ে সরাসরি অধিবেশনে আলোচনার পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি-বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই কমিটি দেশের বিশিষ্টজন ও সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট দেবে। তবে সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু এই ‘সংসদীয় কমিটির’ মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল এবং এর মাধ্যমে সংবিধানের কোনও বিধান সরাসরি পরিবর্তিত হয়নি।”
সংবিধান সংশোধন করতে হলে সরকারের ৫১ শতাংশ ম্যান্ডেট ও নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দেওয়ার ইঙ্গিতও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে আইনমন্ত্র্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “আমরাও চাই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক। আমরা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ ধরে হেঁটে চলেছি।”
পরে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য এখানে (সংসদ) আসি নাই। সংবিধান সংস্কারের জন্য আমরা এসেছি।” তিনি বলেন, “আমরা আশা করি যে, আপনি যখন ফ্লোর দেবেন সেখানে কোনও বৈষম্য করবেন না। আজ বিরোধীদলীয় নেতা উনি মুলতবি প্রস্তাব পেশ করেছেন। সে অনুযায়ী আপনার রুলিংও হয়েছে। সে বিষয়ে আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তারা কিন্তু তাদের বক্তব্যে ব্যাখ্যা রেখেছেন। সংক্ষিপ্ত সময় হলেও তো সে ভিত্তিতে কিন্তু আমাদেরও কথা বলা থাকে। সেই সুযোগগুলা কিন্তু আমাদেরকেও দেওয়া উচিত।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের যে গণভোট হয়েছে, গণরায় হয়েছে, গণভোটের আদেশ ছিল, সে আদেশকে অমান্য করা হচ্ছে। সে আদেশকে অসাংধনিক বলারও বলা হয়েছে। যার ভিত্তিতে আমরা এখানে এসেছি। আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য এখানে আসি নাই। সংবিধান সংস্কারের জন্য এসেছি।”