দেশে বর্তমানে কোনও জ্বালানি সংকট নেই; বরং সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুত ও প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে এ কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, অযথা আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় ও মজুতের প্রবণতার কারণেই বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে। জনমনের বিভ্রান্তি দূর করতেই এ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যেও সরকার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে এবং জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে আমরা সঠিক এবং সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিয়েছি। গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
পরিসংখ্যান তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দিন (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। আজ (৩০ মার্চ) মজুত আছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এ ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। বিপুল সরবরাহের পরও মজুত বৃদ্ধি প্রমাণ করে, সরকার আগাম প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সুদৃঢ় রেখেছে।
আসন্ন ঈদুল ফিতরে মানুষের যাতায়াত, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত আরও বাড়ানোর কথা জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, ‘গত বছরের মার্চ মাসের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে এবার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। জনমনে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’
মন্ত্রী সংসদে জানান, গত বছর মার্চে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন, অকটেন ১ হাজার ২০০ এবং পেট্রোল ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। অথচ চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন (দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন)।
আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
তেজগাঁওয়ের একটি পরিচিত পেট্রোল পাম্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেখানে গত বছরের চেয়ে অকটেন বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বেড়েছে। মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘অকটেন (৬ দশমিক ৮%) ও পেট্রোলের (৬ দশমিক ৭৭%) জন্য ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঠিক চিত্র নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহের প্রবণতায় এ সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, এ সংকট উত্তরণে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়ে ১৫৩ মামলা, ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি।
এপ্রিলে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ এবং দেশীয় উৎস থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পাওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের মজুতে আরও দুই মাসের চাহিদা অনায়াসে পূরণ হবে।
এসময় জ্বালানী তেলের কজুদ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কথা উল্লেখ করে জ্বালানী মন্ত্রী বলেন, বাংলা ট্রিবিউনে গত ২৭ মার্চ ‘জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়া দেশের আরও কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জ্বালানি খাতে সরকারের বিশাল ভর্তুকির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, মার্চ-জুন প্রান্তিকে ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি এবং এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। বৈশ্বিক সংকটেও দেশের পরিবহন, শিক্ষা ও শিল্পকারখানা সচল রাখার চেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।
সীমান্তে পাচার রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘‘সবাই মিলে সাশ্রয়ী ও সচেতন হলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত হওয়া এখন সময়ের দাবি। বিভক্তি নয়, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। সবার আগে বাংলাদেশ।’’