সংসদের টুকিটাকি 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিন ছিলো আজ। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয় অধিবেশন। পরে দুপুরের বিরতির পরে বিকাল সাড়ে ৩টায় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশন শুরু করেন। সন্ধ্যার বিরতির পরে আবার আধিবেশন শুরু করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সংসদের ভেতরে যেমন গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়, তেমনি মাঝেমধ্যেই উঠে আসে নানা ছোট ছোট ঘটনা, মন্তব্য কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত—যেগুলো আলাদা করে নজর কাড়ে জনমনে। এসব টুকিটাকি বিষয় কখনও উসকে দেয় বিতর্ক কিংবা তৈরি করে হাস্যরসের। রবিবার (৫ এপ্রিল) থাকছে সংসদের এমনই কিছু উল্লেখযোগ্য টুকিটাকি ঘটনা। 

মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপিকে রুমিন ফারহানার ধন্যবাদ

মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, “আমি ধন্যবাদ জানাই বিএনপিকে, আমাকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য। মনোনয়ন না দেওয়ার কারণেই আমি বুঝতে পেরেছি বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার কত লক্ষ মানুষের দোয়া, ভালোবাসা, সহযোগিতা আমার পাশে ছিল। একটা দলীয় গন্ডির মধ্যে থেকে নির্বাচন করলে এটা বুঝবার সৌভাগ্য আমার হতো না। 

এসময় তিনি আরও বলেন, মাননীয় স্পিকার আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি দেশনেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। যিনি আমাকে স্নেহ দিয়ে আমাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। আমি বিশ্বাস করি তার অপূর্ণতা কোনোদিন এই সংসদে পূরণ হবে না।  

আওয়ামী লীগের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে আমরা বলিয়েছি স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দশম দিনের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় দাঁড়িয়ে বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে আমি এই কারণে ধন্যবাদ দিতে চাই, বার বার দিতে চাই; কারণ মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেছে আওয়ামী লীগ। আমরা এই মহামান্য রাষ্ট্রপতির মুখ দিয়ে, এই রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই সংসদে আমরা বলিয়েছি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে আমরা বলেছি গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়া।”  

মীর শাহে আলম বলেন, “এই মহামান্য রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগ দ্বারা নির্বাচিত, উনি বক্তব্যে বলেছেন আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট, আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার, আওয়ামী লীগ ভোটচোর। এই কথাগুলো যখন রাষ্ট্রপতি এই সংসদের বলেছেন, এই কৃতিত্ব সম্পূর্ণ বিএনপির এবং সংসদ নেতা তারেক রহমানের।” 

তিনি আরও বলেন, “আজকে বিরোধীদলের বন্ধুদের বলতে চাই, আপনারা রাষ্ট্রপতির ভাষণের দিনে ওয়াকআউট করেছেন। আপনারা ওয়াকআউট না করে যদি বসে থাকতেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কত সুন্দর করে আওয়ামী লীগের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলেছে—এটি যদি আপনারা শুনতেন তাহলে আপনারা আনন্দচিত্তে হাসতেন এবং খুশি হতেন। আমি বলবো এটা আপনাদের দুর্ভাগ্য যে আওয়ামী লীগের দ্বারা নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতি কি সুন্দর করে বলেছেন যে—আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট, দুর্নীতিবাজ, ভোটচোর; এগুলো আমরা সেদিন এই সংসদে শুনেছি মাননীয় স্পিকার।  

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এর আগে বলেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি। এমন ভাগ্যবান ব্যক্তির বক্তব্যের ওপর আলোচনার সুযোগ পাওয়াতে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে এইজন্য ভাগ্যবান বলছি কারণ—যিনি তিন ধরনের তিনটি সরকারের শপথ দিয়েছেন। প্রথমত, তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের শপথ উনি দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, সংবিধানে নাই কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে, সেই সরকারের শপথ তিনি পড়িয়েছেন। সর্বশেষ জনগণের ভোটে অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত মানুষের আকাংক্ষিত সরকার, যেটি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে সেটির শপথও তিনি পড়িয়েছেন।” 

এসময় তিনি বলেন, “বিএনপি এমন একটি সংগঠন যারা তিনটি আন্দোলনকে ধারণ করে এবং তাদের ঘরে তিনটি আন্দোলনের ট্রফি রয়েছে। ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪ তিনটি আন্দোলনের ট্রফিই আমাদের ঘরে। এটা বাংলাদেশের অন্য কোনও রাজনৈতিক দল দেখাতে পারবে না। আওয়ামী লীগ ৭১, ৯০ বলতে পারবে, কিন্তু জুলাই-আগস্টের ট্রফি তাদের ঘরে নাই। বিরোধীদলের বন্ধুরা জুলাই-আগস্ট বলতে পারবে, ৭১ এবং ৯০ এর ট্রফি কিন্তু তাদের ঘরে নাই।” 

রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে আমাদেরকে জেরবার করে ফেলেছে

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যের শেষে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আজকে মাননীয় সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে আমাদেরকে একেবারে জেরবার করে ফেলেছে এবং অসংখ্য মিথ্যা তথ্য এখানে এসেছে। যে দুই-একটার প্রতিবাদ নিজেও আপনি (স্পিকার) করেছেন। আমি অনুরোধ করবো কোন অসত্য তথ্য যেন কেউ এই মহান সংসদে পরিবেশন না করেন। জেনেশুনে সতর্কতার সঙ্গে আমাদের সবারই দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। যে জিনিসগুলো অসত্য, বিভ্রান্তিকর আমি বলবো এগুলো এক্সপাঞ্জ করা উচিত। 

তার এই বক্তব্যের পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধী দলের নেতা আমি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখবো। যদি সেখানে কোনও অসংসদীয় বা অসত্য তথ্য থাকে সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে।  

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নামে আল্লাহর কাছে বিচার দিতে চেয়েছেন মুন্সীগঞ্জের এমপি 

মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন নিজের বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “এখানে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আছেন। তার সঙ্গে ১৯৯১ সালে আমি হেরা গুহায় উঠেছিলাম। কদমে কদমে আমরা দুজন পা রেখেছিলাম। আল্লাহর রহমতে তার দোয়াটা হয়তো কবুল হয়েছে কদমে কদমে উনি ইনশাআল্লাহ ফুল মিনিস্টার হয়ে গেছেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমার কোনও খেদ নাই। কিন্তু মুন্সীগঞ্জের শহরের যে প্রস্তাবিত ও জমি অধিগ্রহণকৃত যে হাসপাতাল এখানে যদি উনি অচিরেই পা না ফেলেন— তাহলে কিন্তু আমি ওই আল্লাহর কাছে বিচার দেবো। আল্লাহ ওঠার সময় কিন্তু আমরা দুইজন একসঙ্গে উঠেছিলাম, আপনি কেন আমাকে ফেলে দিয়ে এখন আমাকে ভুলে গেলেন।।”  

তার এই বক্তব্য চলাকালে হাসির রোল ওঠে সংসদ সদস্যদের মধ্যে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাসতে হাসতেই উপভোগ করেন তার বক্তব্য।