বাংলাদেশ ও নরওয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (২ জুন) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
বৈঠকে উভয়পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে নরওয়ে অন্যতম।” বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দেশটির ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যার সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।”
বৈঠকে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি জানান, নরওয়ে এখন প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরওয়ের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন। তিনি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, পাটজাত পণ্য ও হস্তশিল্পসহ উচ্চমূল্যের পণ্যের রফতানি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও প্যাকেজিং শিল্পে নরওয়েজিয়ান বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নরওয়ের আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, “জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। একারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।”
তিনি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, ডিজিটাল উদ্ভাবন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় বৃদ্ধির পাশাপাশি নরওয়ের শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
বৈঠকে নরওয়েতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভূমিকাও প্রশংসিত হয়। উভয়পক্ষ মনে করে, এই জনগোষ্ঠী দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য নরওয়ের মানবিক সহায়তা এবং নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তবে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে নরওয়েসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।”
জবাবে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত বলেন, “জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ ও নরওয়ের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।” বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে নরওয়ে পাশে থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
বৈঠকে নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা সারোয়ার জাহান চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।