ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ফাও খাওয়া

অবশেষে খুলল ঢাবির জিয়া হল ক্যান্টিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলঅভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাকে জিয়া হলে অবৈধ ঘোষণা এবং বকেয়া রয়েছে এমন সবাইকে সাত দিনের মধ্যে ক্যান্টিনের টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়ার পর খুলে দেওয়া হয়েছে ঢাবির জিয়া হল ক্যান্টিন। রবিবার হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জিয়া রহমানের এই পদক্ষেপের কারণে দুপুরে ক্যান্টিনটি খুলে দেওয়া হয়।
এর আগে ফাও খাওয়া, বকেয়া বিল পরিশোধ না করার প্রতিবাদ করায় এবং রুমে খাবার না দেওয়ায় গত শুক্রবার ক্যান্টিন মালিক সাহাবুদ্দীনকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে এর বিচারের দাবিতে ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের ক্যান্টিন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন ক্যান্টিন মালিক। এতে চরম ভোগান্তিতে পরে হলটির কয়েক হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী।
জানা যায়, ক্যান্টিন থেকে নিয়মিত তিন বেলা খাবার পাঠাতে হতো হল শাখা ছাত্রলীগ নেতাদের ২৮টি কক্ষে। মাস শেষে কেউ ওই খাবারের বিল নামমাত্র পরিশোধ করতো আবার কেউ করতো না। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার মতো বকেয়া হওয়ায় ক্যান্টিন মালিক হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সম্প্রতি ওই রুমগুলোতে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেন। গত শুক্রবার দুপুরে হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী হাসিব(কক্ষ নং ২১০) তার কক্ষে খাবার দিতে বললেও ক্যান্টিন মালিক তাতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে দুপুর দুইটার দিকে গাজী হাসিব ৫-৬ জন কর্মী সঙ্গে নিয়ে ক্যান্টিনের মালিককে মারধর করেন। এসময় ঘটনার বিচার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যান্টিন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হলের খাবারের মান বৃদ্ধির জন্য কিছুদিন আগে আমরা অ্যাকশন নিয়েছিলাম। যার মধ্যে হলের বিভিন্ন রুমে খাবার দেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরইমধ্যে গত শুক্রবার রুমে খাবার না দেওয়ায় এক ছেলে এসে ক্যান্টিন মালিককে মারধর করে। যার কারণে তিনি(ক্যান্টিন মালিক) ইমোশনাল হয়ে ক্যান্টিন বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। আমরা মারধর করা ওই ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা জানতে পেরেছি- গাজী হাসিব হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছে। তাই তাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং যারা ক্যান্টিনে বকেয়া করেছে, তাদেরকে সাত দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।’

ক্যান্টিন মালিক সাহাবুদ্দীন জানান, হলের বেশ কয়েকজন নেতার রুমে নিয়মিত খাবার দিতে হয়। মাস শেষে তারা নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন না। করলেও ৫শ’-এক হাজার টাকা নামমাত্র দেন। বিষয়টি হল প্রভোস্টকে জানানো হলে চলতি মাসের ৩ তারিখ থেকে প্রভোস্ট খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেন। গত শুক্রবার রুমে খাবার না দেওয়ায় গাজী হাসিব এসে আমাকে মারধর করেন।

এ বিষয়ে গাজী হাসিবের সঙ্গে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত শুক্রবার ক্যান্টিন থেকে রুমে খাবার দিতে বলেছিলাম। তখন বলা হয় যে, হল-অফিস থেকে রুমে খাবার দেওয়া নিষেধ আছে। কিন্তু এরপরই দেখি অন্য একটি রুমে খাবার দেওয়া হচ্ছে। তখন ক্যান্টিন মালিককে গিয়ে অন্য রুমে খাবার দেওয়ার কারণ জানতে চাই।’

এরপর ক্যান্টিন মালিককে মারধর করার বিষয়ে জানতে চাইলে ফোন কেটে দেন গাজী হাসিব।

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের দুটি ব্লকের ৫০টি কক্ষে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল শাখার নেতারা অবস্থান করছেন। হলের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী ২৮টি কক্ষে ক্যান্টিন থেকে নিয়মিত তিন বেলা খাবার পাঠাতে হয়।

ক্যান্টিন মালিকের অভিযোগ- এই খাবার পাঠাতে দুজন আলাদা ক্যান্টিন বয় রাখতে হয়। আর মাস শেষে ২৭টি রুমের কেউ নিয়মিত বিল পরিশোধ করতো না আর করলেও পরিশোধ করতো নামমাত্রই।

হলের কক্ষগুলো হচ্ছে ‘এ’ ব্লকের- ২১৬, ২১৭, ২১৮, ২১৯, ২২১, ২২৬, ২২৭, ৩১৮, ৩২৭, ৩২৫, ৪১৯, ৪২১, ৫১৯, ৫২০ ও ৫২৫ নম্বর কক্ষ। অন্যদিকে, ‘বি’ ব্লকের কক্ষগুলো হচ্ছে- ২০৬, ২০৭, ২০৮, ২০৯, ২১০, ২১১, ৩০১, ৩০২, ৩০৪, ৩০৬, ৩০৯, ৩১৪ ও ৪০৫ নম্বর।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ওই ক্যান্টিন থেকে ১২০ মিলের (প্রায় ৫ হাজার) খাবার বাকেয়া রয়েছে গাজী হাসিবের নামে। এছাড়া, হলের দফতর সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেনের কাছ থেকে খাবার বাবদ বকেয়া আছে ২০ হাজার টাকা। কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কমিটি গঠিত হওয়ার পর হল শাখা ছাত্রলীগের একটি অংশের নেতাকর্মীরা ক্যান্টিনে বকেয়া খাওয়ায় তাকে হল থেকে মারধর করে বের করে দেয়। এছাড়া হল শাখা ছাত্রলীগের ক্রিড়া সম্পাদক গোলদার আল মামুনের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা, উপ-পাঠাগার সম্পাদক মো. মাহবুবুর রহমানের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা, উপ-স্কুলছাত্র বিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল বাশারের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা, ছাত্রলীগ কর্মী বখতিয়ারের কাছ থেকে আট হাজার টাকা, উপ-সম্পাদক সাদিকুলের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা পাবেন ক্যান্টিন মালিক। এদের মধ্যে হাসিব, মামুন, মাহবুব, বাশার, সাদিকুল, বখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহের হোসেন প্রিন্সের অনুসারী এবং মোজাম্মেল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসানের অনুসারী। জানা যায়, ক্যান্টিনে এক-দুই হাজার টাকা বকেয়া আছে এমন একাধিক নেতা রয়েছে ওই হলে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব এবং হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে অনুরোধ করবো যেন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কেননা হলে বকেয়া খাওয়া একটি অনৈতিক কাজ। সুতরাং ছাত্রলীগ কোনও অনৈতিক কাজকে প্রশ্রয় দেবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহের হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘কিছুদিন আগেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং আমি হলের প্রভোস্টকে বকেয়া খাওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। রুমে খাবার সরবরাহ না করার কথাও বলা হয়েছে। এরপরও যারা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হল প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি এবং ছাত্রলীগও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

/এসআর /এএইচ/