করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে পৌনে ৪ লাখ টাকা, সারা বছরই রিটার্ন জমার সুযোগ

ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য স্বস্তির বার্তা দিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছর থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা (পৌনে ৪ লাখ) করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে নির্দিষ্ট সময়ের পরিবর্তে সারা বছরই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নতুন করমুক্ত আয়সীমা আগামী অর্থবছরের পাশাপাশি ২০২৭-২৮ অর্থবছরেও বহাল থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্য বাড়তি সুবিধা

সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই সীমা ৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা করা হয়েছে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মা-বাবা বা আইনানুগ অভিভাবক তাদের প্রত্যেক প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত আয়ের সুবিধা পাবেন। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দেন।

বাতিল হলো ৫ শতাংশ কর স্তর

নতুন বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের করহার কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ৫ শতাংশ করহার সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, করমুক্ত আয়সীমার পরবর্তী প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, কর কাঠামো সহজ করা হলেও ৫ শতাংশ স্তর বাতিল হওয়ায় কিছু করদাতার ক্ষেত্রে করের বোঝা বাড়তে পারে।

সারা বছর রিটার্ন, আগেভাগে দিলে কর ছাড়

আয়কর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা বিশেষ প্রণোদনা পাবেন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ছাড় পাওয়া যাবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত কোনো কর ছাড় বা জরিমানা থাকবে না।

তবে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হবে। আর এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন দিলে করের ৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।

মূল্যস্ফীতির চাপে করমুক্ত সীমা বাড়ানোর দাবি

সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছিল। এরপর গত তিন বছরে আয়সীমা অপরিবর্তিত থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

নতুন বাজেটে সেই দাবি আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব পুরোপুরি মোকাবিলার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।