দুর্নীতি সব জায়গায় হয়, ঘুরেফিরে দোষ রাজনীতিবিদদের: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকার সব পক্ষের সহযোগিতা পায়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি সব জায়গাতেই হয়, কিন্তু ঘুরেফিরে সব দোষ রাজনীতিবিদদের ওপরই পড়ে।

সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে দুদকের অতিরিক্ত মঞ্জুরির দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।

গত ১১ জুন বাজেট পেশের পর ১৪ জুন এবং ১৫ জুন দফায় দফায় সম্পূরক বাজেট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন বিরোধী দল ও সংসদ সদস্যরা। রবিবারও সংসদে একাধিক সদস্য বলেন, অর্থ অপচয়ের উদ্দেশ্যেই সম্পূরক বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সোমবারও ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় একই ধরনের অভিযোগ ওঠে।

সোমবার সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুদকের অতিরিক্ত মঞ্জুরির দাবি উত্থাপন করেন।

ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠনের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, সার্চ কমিটি আগের আইনেও ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত অধ্যাদেশ গ্রহণ করা না গেলেও আগের আইনটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। সেই কাঠামোর মধ্যেই সার্চ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা আন্তরিক ছিলাম, চিঠি দেওয়া হয়েছে, সার্চ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। গতকাল (রবিবার) প্রধান বিচারপতি দীর্ঘ সময় পর তার প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছেন। এখন সার্চ কমিটি গঠিত হবে, দুদকও গঠিত হবে।

তিনি বলেন, এটি একটি মধ্যবর্তী ব্যবস্থা। দুদক আইন সংসদে পাস হলে আরও শক্তিশালী কমিশন গঠন করা হবে।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি সব জায়গায় হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায় রাজনীতিবিদদের ওপরই বর্তায়। কারণ অধিকাংশ ফাইলেই শেষ স্বাক্ষরটি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকেই দিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, শক্তিশালী দুদক গঠন করা হলে দুর্নীতির অনেক বিষয়ই আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

ধর্ষণ নিয়ে মন্তব্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, ধর্ষণের ক্ষেত্রে কোনও ছোট-বড় বা ভিন্ন সংজ্ঞা হতে পারে না। সব ধর্ষণই সমান অপরাধ এবং এর বিচারেও কোনও দ্বিচারিতা চলতে পারে না।

তিনি বলেন, কিছু সদস্যের বক্তব্য নিয়ে তিনি বিস্মিত, তারা আসলে ধর্ষণের পক্ষে না বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশ থেকে পাচার হওয়া প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

 

তিনি শ্বেতপত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাট ও রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ঋণের অর্থ দিয়ে একাধিক পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল।

তিনি বলেন, এই অর্থ ফিরিয়ে আনতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

রুমিন ফারহানার বক্তব্য

এর আগে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, গুগল সার্চে দেখা যায় দুর্নীতিতে শীর্ষে রয়েছে রাজনীতিবিদরা, এরপর আমলারা। তিনি বলেন, রাজনীতি পেশা হিসেবে উল্লেখ করা হলে বিষয়টি অবাক করার মতো।

তিনি আরও বলেন, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টানা দুর্নীতিতে ‘চ্যাম্পিয়ন’ ছিল।

তিনি অতীত ও বর্তমান সরকারের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে দুদককে শক্তিশালী করার দাবি জানান।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দুদকের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। নিয়োগ ও তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন রুমিন ফারহানা। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সম্পূরক বাজেট অনুমোদন

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি নিট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭.৯০ লাখ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭.৮৮ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সংশোধিত বাজেটে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রণালয় জানায়, ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, আর ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বরাদ্দ কমেছে ৫৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।

সংসদের অনুমোদনের মাধ্যমে ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বাজেটের অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।