নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট, নতুন মুদ্রানীতি এবং বিনিয়োগ-সহায়ক একাধিক নীতিগত ঘোষণার মধ্য দিয়ে বুধবার (১ জুলাই) যাত্রা হলো নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭)। সরকারের লক্ষ্য—অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটে ঘোষিত এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ টানতে পারবে? নতুন কর্মসংস্থান কতটা সৃষ্টি হবে? নাকি উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের সংকট, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে লক্ষ্যগুলো অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে? অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— নতুন অর্থবছরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে।
বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সরকার স্পষ্টভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষিত ‘থ্রি আর (রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন)’ কৌশলের মূল লক্ষ্যই হলো—বেসরকারি খাতকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
এ লক্ষ্যে ব্যবসা সহজীকরণ (ডিরেগুলারেশন)) কর্মসূচির আওতায় একাধিক সংস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে সাত দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান, ৪৮ ঘণ্টায় কোম্পানি নিবন্ধন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ১০ দিনের মধ্যে ভিসা প্রদান, প্লাগ অ্যান্ড প্লে শিল্প সুবিধা, গ্রিন চ্যানেলে পণ্য খালাস, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা, করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড, সুকুক ও অবকাঠামো তহবিলের ব্যবহার বৃদ্ধি।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ব্যবসার ব্যয় ও সময় কমবে, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মসংস্থানে বড় প্রতিশ্রুতি
নতুন বাজেটে কর্মসংস্থানকে সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের ঘোষণাগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রযুক্তি খাতে বছরে ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য। বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান। গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে ৩ লাখ ৭০ হাজার শ্রমিকের কাজ। গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থান। হাইটেক পার্কে ১৫ হাজার কর্মসংস্থান। ২ লাখ ২০ হাজার তরুণকে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ। এসএমই খাতে ২ হাজার কোটি টাকার সহজ ঋণ। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন মার্কেটিং ও স্টার্টআপে প্রশিক্ষণ এবং ঋণ সহায়তা। প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করে বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বড় ধরনের ঘোষণা এসেছে। আগামী পাঁচ বছরে জিডিপিতে আইসিটি ও টেলিকম খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা, বছরে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনা নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
ব্যাংক খাতের সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত কয়েক বছরে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ তহবিল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রফতানিতে গতি ফিরবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ীরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করছেন, অতীতের মতো যেন এই অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পরিবর্তে প্রভাবশালীদের হাতে না যায়। তাদের মতে, বন্ধ শিল্প চালুর পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা শিল্পকারখানাগুলো টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বাস্তবতা বলছে, বিনিয়োগের পথে বাধা এখনও বড়
যদিও বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব নানা ঘোষণা রয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি অনুকূল নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ দ্রুত কমার সম্ভাবনা নেই। ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগে যাওয়া অনেক উদ্যোক্তার পক্ষেই সম্ভব হবে না।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এখনও নিশ্চিত হয়নি। ডলারের বাজারে চাপ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায়, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে।
কর ছাড় নয়, দরকার আস্থা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, শুধু কর ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। তার ভাষায়, বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা, উচ্চ সুদের হার, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ভূমি, বন্দর দক্ষতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা।
তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে আটকে রয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে বাস্তব সংস্কার, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।’’
তার মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে লক্ষ্য ঘোষণার ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের ওপর। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ মনে করেন, রাজস্বনীতিতে বিনিয়োগবান্ধব সুবিধা দেওয়া হলেও মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন নেই। তার মতে, টানা চার বছর সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অথচ উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও ধীর হয়ে পড়ছে।
ডিসিসিআই বলছে, সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে ব্যাংকের তারল্যের বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যাচ্ছে। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু বাজেট বা মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আর্থিক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
রাজস্ব সংগ্রহও বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ বিদায়ী অর্থবছরে আদায় হয়েছে চার লাখ কোটির কিছু বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত না হলে সরকারকে আরও বেশি ব্যাংকঋণ নিতে হতে পারে, যা আবার বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করবে।
কর্মসংস্থান বাড়বে, তবে...
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রযুক্তি, এসএমই, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, অবকাঠামো, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং প্রবাসী কর্মসংস্থান—এই ছয়টি খাত আগামী কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান দেখানোর পরিবর্তে উৎপাদনশীল ও স্থায়ী চাকরি সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, টেকসই কর্মসংস্থান ছাড়া মানুষের আয় বাড়বে না, আর আয় না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপও কমবে না।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
নতুন অর্থবছরের বাজেট ও মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনের জন্য শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ঘোষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বাজেটের বড় বড় প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই—নীতির ঘোষণা কি বাস্তব বিনিয়োগ ও টেকসই কর্মসংস্থানে রূপ নেবে, নাকি আগের মতোই বাস্তবতার দেয়ালে আটকে যাবে?