আরবি হরফের পতাকা নিয়ে উগ্রবাদী তৎপরতার প্রমাণ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশের বিভিন্ন স্থানে আরবি হরফ লেখা পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় কারা জড়িত প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, কিছু মানুষ ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করতে পারে। কিছু সংগঠনকে চরমপন্থি বলা যেতে পারে। তবে দেশে কোনও সংগঠিত জঙ্গিবাদী তৎপরতা বা বড় ধরনের উগ্রবাদী সংগঠনের অস্তিত্ব আছে বলে আমরা মনে করি না।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, বিদেশে গ্রেফতার আসামিদের প্রত্যর্পণ, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো, মাদকবিরোধী অভিযান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদী বা মৌলবাদী কোনও শক্তির উত্থান ঘটতে দেওয়া হবে না।

মাদকবিরোধী অভিযানে ডগ স্কোয়াড, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ

বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে দেওয়া হলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।

তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার, বাণিজ্য ও অপব্যবহার রোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি কঠোর মাদকবিরোধী আইন পাস করা হয়েছে। তবে আইনটির পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

মন্ত্রী জানান, অধিদফতরে ডগ স্কোয়াড গঠন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ, পরীক্ষাগার স্থাপন এবং তদন্তক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য আর্থিক সংস্থান ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে কিছুটা সময় লাগবে।

তিনি বলেন, আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিরস্ত্র কর্মকর্তাদের অস্ত্রধারী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান করতে হতো। অনেক কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ভবিষ্যতে সে অবস্থা থাকবে না।

নতুন আইন গেজেট প্রকাশের সঙ্গে কার্যকর হয়েছে উল্লেখ করে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এখন থেকেই ওই আইনের অধীনে মামলা ও তদন্ত চলবে। শক্তিশালী শাস্তির বিধান নিজেই অপরাধীদের জন্য প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।

চাঁদাবাজি ও জুয়া ঠেকাতে আইন সংস্কারের উদ্যোগ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু মাদক নয়, জুয়া, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা রয়েছে। দণ্ডবিধিতে চাঁদাবাজির শাস্তি ও মামলার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা যায় কি না, সরকার তা পর্যালোচনা করছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি মামলা না করলে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বা রাষ্ট্র নিজে থেকে মামলা করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদকমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী আইন যেমন দরকার, তেমনই মানুষের মানসিক পরিবর্তন ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণও প্রয়োজন। যুবসমাজকে রক্ষায় গণমাধ্যমকে জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে।

অনিয়মকারী পুলিশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে

পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের তালিকা প্রকাশের দাবি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পেশাদারত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা যেমন ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করছি, তেমনই অনিয়মের জন্য তিরস্কার ও শাস্তিও দিচ্ছি।

চট্টগ্রামে একজন ক্রিকেটারকে হয়রানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে বিএনপির পরিচয় দিয়ে তিন সাংবাদিককে হয়রানি ও দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঘটনাটি তার নজরে আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে।

শহীদের প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রায় এক হাজার ৪০০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও সরকারের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে।

তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের আগে অনেক হাসপাতাল থেকে নথিপত্র গায়েব করা হয়েছে। অনেককে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, লাশ গুম করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এখনও অনেক স্বজন কবর খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

গণকবর থেকে উদ্ধার মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে শহীদের তালিকা আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গেজেটভুক্ত শহীদ এবং আহতদের তিনটি শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করলেও ব্রিফিংয়ের সময় সঠিক সংখ্যা তার সামনে নেই বলে জানান মন্ত্রী।

ভুয়া মামলা ও হাজারো আসামি নিয়ে আবার বৈঠক

জুলাই আন্দোলনে নিহত দেখিয়ে মামলা করা হলেও কথিত নিহত ব্যক্তি বিদেশে জীবিত রয়েছেন– এমন ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক তালিকা তৈরি হয়েছিল। পর্যাপ্ত তদন্তের সুযোগ না থাকায় সেখানে ভুল থাকতে পারে।

তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে কেউ জীবিত প্রমাণিত হলে তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে দায়ের করা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্তে নির্দোষ ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারার পুলিশ প্রতিবেদনের মাধ্যমে অভিযোগপত্র দেওয়ার আগেই বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এটা নিয়ে আমরা আবার বসবো।

মিথ্যা অভিযোগকারী বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনে মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করতে পারে। তবে বাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ার।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়াবে বাংলাদেশ

সাম্প্রতিক বিদেশ সফর সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি জাতিসংঘ পুলিশপ্রধানদের সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম বৃহৎ অংশগ্রহণকারী দেশ হওয়ায় সম্মেলনটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তিনি জানান, সফরে জাতিসংঘের তিন জন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, শান্তি বিনির্মাণ এবং লজিস্টিক সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই ভালো।

নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয় সরকার

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাহী বা প্রশাসনিক আদেশে কোনও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হোক– এটি বিএনপি ও সরকারের নীতিগত অবস্থান নয়। আমরা চাই, সবকিছু বিচারিক ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হোক।

তবে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইন সংশোধনের ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এখন ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচার করা যায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এবং দেশবাসী মনে করি, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ দাখিল হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হবে।

তদন্ত দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত দলকে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।