রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে কেন পদত্যাগ করতে হলো

নানা জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকালে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের উদ্দেশে চিঠি পাঠিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে সরাসরি দিতে হয়। তাই থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় ফেরেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পদত্যাপত্র হাতে পাওয়ার পর বিকালে সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এ সময় স্পিকার সাংবাদিকদের জানান, সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

পদত্যাগপত্রে শারীরিক ও মানসিক কারণ দেখানো হলেও নেপথ্যে নানা বিষয় জড়িত বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। ৫ আগস্টের পর পরই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি না মানা, শীর্ষ আমলা-পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন করা হলেও শুধু সাহাবুদ্দিনকে বহাল রাখার ক্ষেত্রে বিএনপির অমতকে দায়ী করে আসছেন দলটির বলয়ের বাইরের দল ও সংগঠনের নেতারা। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই রাষ্ট্রপতির অপসারণের ক্ষেত্রেও প্রধান বাধা ছিল বিএনপি। আবার সরকার গঠনের পর গত ৫ মাসে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর কোনও উদ্যোগ নেয়নি দলটি। বরং রাষ্ট্রের সব জায়গায় তাঁকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সম্মান দিয়েছেন সরকারপ্রধান। তবে সম্প্রতি গুঞ্জন ওঠে— চিকিৎসার জন্য গত ৯ মে লন্ডন সফরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন টেলিফোনে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপরই তার পদত্যাগের বিষয়টি জোরেশোরে সামনে আসে। গত দুই দিন ধরে খবর ছড়িয়ে পরে যে, তিনি পদত্যাগ করছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে।

এরইমধ্যে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণ নিয়ে অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির অভিপ্রায়কে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, এত দিন সরকার গঠন ও শপথগ্রহণসহ সাংবিধানিক কিছু কার্যক্রমের জন্য রাষ্ট্রপতিকে তাঁর পদে বহাল রেখেছে বিএনপি। হয়তো এ মুহূর্তে তার প্রতি কোনও আস্থা রাখতে পারছেন না দলটির হাইকমান্ড। তাই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়ে থাকতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রপতি শারীরিক অসুস্থতা থেকেই পদত্যাগ করতে পারেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আসলে রাষ্ট্রপতির তো নির্বাহী কোনও ক্ষমতা নেই। তাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের রাজনৈতিক কোনও তাৎপর্য নেই। তিনি সত্যিকারে অসুস্থতায় পদত্যাগ করতেই পারেন। আবার সরকারের তরফে কোনও নির্দেশনাও থাকতে পারে। কারণ সরকার গঠনের পর তো বিএনপি সব ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাকি ছিল রাষ্ট্রপতি পদটি। তাই সর্বশেষ সেখানেও নিজেদের লোক বসানোর প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’

গুঞ্জনই হলো বাস্তব, যা বলেছিলেন মন্ত্রীরা

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ৯ মে শারীরিক চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে ভারতে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। এ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হতে পারে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমেও এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়।

কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কারও পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি৷ বরং বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন সরকারে দায়িত্বশীলরা। একই দিনে একটি অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন ‘‘রাষ্ট্রপতি বিদেশে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন এমন কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য আমরা পাইনি। এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে।’’ তার পদত্যাগের বিষয়টি জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি।

একই আচরণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে অথবা স্বাস্থ্যগত বা যেকোনও কারণে চাইলে তার সে অপশন আছে। কিন্তু আমরা তো জানি না।’’ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। তিনি আরও বলেন, ‘‘এখানে সরকারের কোনও পদক্ষেপ নেই ।’’

সর্বশেষ শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুলও বিষয়টিকে গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান।

তড়িঘড়ি কেন?

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি জানিয়ে রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। একই দাবিতে মিছিল সমাবেশ করেছে জামায়াত ও এনসিপিসহ সমমনা দলগুলো। এমনকি বঙ্গভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। যদিও তখন বিএনপির পক্ষ থেকে কোনও সায় পাওয়া যায়নি। তাই তার পদত্যাগে পদক্ষেপ নেয়নি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার— এমন কথাও প্রচলিত আছে। তবে তখন রাষ্ট্রীয় কোনও অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিকে রাখা হয়নি। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতেও দেখা যায়নি তাকে।

যদিও বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় ঈদগাহেও একসঙ্গে নামাজ পড়েন ও কোলাকুলি করেন দুই জন।

এ সময়ে সরকারের বিপক্ষে কোনও অবস্থান নেননি রাষ্ট্রপতি। বরং অনেক সময় শেখ হাসিনা সরকারের বিপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন তিনি। জয়বাংলার বদলে জিন্দাবাদ বলে বক্তব্য শেষ করেছেন। এ নিয়ে অনেকের ট্রলের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। তাই ধরে নেওয়া হয়েছিল—তাঁকে এত সহজে সরাবে না সরকার। তারপরও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে কেন বিদায় নিতে হলো, এমন আলোচনাও হচ্ছে। কেউ বলেন, সরকার সবক্ষেত্রে নিজেদের লোক বসাতে চায়। আবার অনেকের ধারণা—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণায় সরকারের মধ্যে উদ্বেগ থাকতে পারে। তখন সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকলে ভিন্ন রকম পরিস্থিতি হতে পারে। এ কারণে তড়িঘড়ি করে তাঁকে পদত্যাগ করানো হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এত দিন রাষ্ট্রপতিকে সহ্য করা হলো, কিন্তু ‘দুই দিন’ সহ্য করা গেলো না! জরুরি ভিত্তিতে স্পিকারকে দেশে ডেকে আনতে হলো। এর কারণ বিশ্লেষণ করা কঠিন। অথচ আন্দোলনকারীরা অনেক আগে থেকেই তাঁকে সরানোর দাবি করে আসছিল। সরকার হয়তো চেয়েছে, তাই তিনি পদত্যাগ করেছেন।’’ আর সামনে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁকে সরে যেতে হলো কিনা, এমন প্রশ্নে মান্না বলেন, ‘‘হতে পারে। তবে এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা যাচ্ছে না।’’

বিএনপির অভিপ্রায় নাকি বিরোধী দলের চাপ?

হঠাৎ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘সরকারের অভিপ্রায়’ বলে দেখছেন কেউ কেউ। আবার বিরোধী দলের চাপের কারণে রাষ্ট্রপতিকে সরানো হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধর্মভিত্তিক দলের এক নেতা জানান, বিএনপি রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে যা আদায় করার দরকার তা করে নিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে তাকে আর দরকার নেই। তাই পদত্যাগে বাধ্য করানো হয়েছে। অন্যদিকে বাম ঘরানার এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আসলে বর্তমান বিরোধী দল তো সরকারেরই সহযোগী শক্তি। ওপরে বিরোধী দল হলেও ভেতরে ভেতরে তাদের বোঝাপড়া আছে। তাই বিরোধী দলকে খুশি করতেও সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে ভিন্ন কথা বলছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বিএনপির প্রত্যাশা অনুযায়ীই ভূমিকা রেখেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। নিজের জায়গা থেকে তাঁর তেমন কিছু করা সম্ভব ছিল না। তাই পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়। তারপরও বলবো, বিএনপির অভিপ্রায়েই এ ঘটনা ঘটতে পারে।’’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহছানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাই পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিটি মানুষের প্রাণের দাবি ছিল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ। তাই তাঁর পদত্যাগে আমরা দলগতভাবে খুশি।’’ বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে সরকারের কাছে দাবি জানানো হলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি অসুস্থতার কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন, এতটুকুই জানি।’’ এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।