ভিকটিম জানান, বিয়ের ভুয়া কাগজ বানিয়ে ধর্ষণের পর তাকে হোটেলে ফেলে রেখে যান এলাকার প্রভাবশালী আবদুর রহমান। শুরুতে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। বয়সের ফারাকের কারণে ভিকটিমের অভিভাবকরা ওই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠেন রহমান। পরে এই ব্যক্তি কিশোরীর সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সেক্ষেত্রেও ব্যর্থ হলে ভয়ভীতি প্রদর্শন শুরু করেন। পরে ভিকটিমকে নানা প্ররোচনার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার শহরে নিয়ে যান। সেখানে ভিকটিম নিমরাজি হয়ে শরিয়াহ আইন অনুযায়ী বিয়ের ব্যবস্থা নিতে বললে, গতবছর ২৭ এপ্রিল ১০ লাখ টাকা নোটারি করে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। ভিকটিম নিজেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বললেও কাগজপত্রে তার বয়স দেখানো হয়েছে ২৬ বছর। আর অবদুর রহমানের বয়স ৪৫ বছর দেখানো হলেও তার প্রকৃত বয়স বেশি বলে জানা গেছে।
গত বছরের ২৪ অক্টোবর আবারও টেকনাফের একটি আবাসিক হোটেলে তাকে নিয়ে যান রহমান। এরপর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে ফেলে চলে যান তিনি। ভিকটিমের পরিবার সামাজিকভাবে বিয়ের বিষয়ে চাপ দিলে ভিকটিম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এদিকে গর্ভধারণ নিশ্চিত হলে ঘটনার প্রায় দুইমাস পর ২৭ ডিসেম্বর টেকনাফ মডেল থানা নারী শিশু নির্যাতন ৯(১) ধারায় মামলা করা হয়। ওই আইনে আছে, যদি কোনও পুরুষ কোনও নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন আইনজীবী রেবেকা সুলতানা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৬ মার্চ আব্দুর রহমান হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন যেটি ২৭ মার্চ শেষ হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে নতুন করে আর কোনও পরোয়ানাও জারি হয়নি। তিনি জামিনে এসে ভিকটিমকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন বলে জেনেছি। আগামী ২৫ এপ্রিল মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে, সেইদিনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আবদুর রহমান বিদেশে চলে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে কিছু জানেন কিনা- এ প্রশ্নে রেবেকা বলেন, আমি শুনেছি। জামিনে থাকার সময় কেউ চাইলে অসৎ উপায়ে দেশত্যাগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের যা করণীয় সেটা করছি। তার ভয়ভীতি দেখানো বা মামলা তুলতে প্ররোচিত করতে চেষ্টার বিষয় আমরা আদালতের নজরে আনবো।
এ বিষয়ে জানতে আবদুর রহমানকে মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। ভিকটিম টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওসিসিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কী পরিস্থিতিতে তিনি চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন- জানতে চাইলে নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম অফিসার সুব্রত সরকার বলেন, আমরা চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছি। আহত ছিলেন। কিশোর বয়সী মেয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনও হুমকি ধামকির কথা আমরা জানি না। জামিনে থাকলেও আইনি কাজতো থেমে নেই। আমরা ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষা করছি।
আসামি দেশত্যাগ করার চেষ্টা করছেন, এমন অভিযোগের বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না উল্লেখ করে বলেন, কিশোরীর গর্ভের শিশুর দায়িত্ব নিতে আবদুর রহমান অস্বীকার করায় ডিএনএ টেস্ট নিয়েও আমাদের ভাবতে হচ্ছে। উনি যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য আমরা সচেষ্ট। যদিও উনি এখন কোথায় অবস্থান করছেন তা এই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানাতে পারেননি।
ভিকটিম ১৬ ডিসেম্বর টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। পরবর্তীতে ভিকটিমকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ওসিসি (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল/সেন্টার) ওয়ার্ডে পাঠানো হয় এবং ভিকটিম সেখানে চিকিৎসা নেন। এ মামলাটি শুরু থেকে পর্যবেক্ষণ করছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম’।
এ বিষয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘মামলাটির বিষয়ে আমরা অবগত। মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় শুরু থেকেই আমরা মামলাটি পর্যবেক্ষণ করছি যাতে ভিকটিমকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সংস্থা বিএনডব্লিউএলএ ভিকটিমের পক্ষে মামলাটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
/ইউআই/এজে/