কয়েক দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে কমবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: তথ্য উপদেষ্টা

দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কয়েক দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগে থেকে থাকা সংকট আরও তীব্র হয়েছে। টার্মিনালটি পুনরায় চালু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং বিদ্যুতের ওপর তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাপও কমে আসবে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। 

এ সময় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও প্রিপেইড মিটার নিয়ে অভিযোগ, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ, ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান, অপতথ্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার এবং নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনের দেশে ফেরার বিষয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।

এলএনজি টার্মিনাল অচল হওয়ায় সংকট বেড়েছে

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ঢাকার বাইরের বড় একটি অংশে ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই কষ্টের বিষয়টি উপলব্ধি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশে দৈনিক প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করতে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে এলএনজি গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের দুটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি প্ল্যাটফর্মে দুর্ঘটনার পর সেটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ কমে গেছে।

এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার নিজের বাসাতেও অনেক সময় গ্যাসের চাপ থাকে না। ফলে আমি নিজেও এ সংকটের একজন ভুক্তভোগী।”

গ্যাসের সংকটে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা

তথ্য উপদেষ্টা জানান, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বেশি ব্যয়বহুল ডিজেল ও অন্যান্য তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

তিনি বলেন, তরল জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ব্যয় অনেক বেশি। জনসাধারণের অর্থ সাশ্রয়ের জন্য সাধারণ সময়ে এ ধরনের জ্বালানির ব্যবহার কম রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বর্তমান সংকট মোকাবিলায় ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে যেসব শিল্পকারখানা গ্যাস নিয়ে নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতো, তারাও গ্যাস না পেয়ে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “গ্যাসের ঘাটতির কারণে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র চালিয়েও পুরো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।”

ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে

ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, চলমান সংকট নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। অচল এলএনজি টার্মিনালটি পুনরায় কার্যকর করার কাজ চলছে। তবে টার্মিনালটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ সক্ষমতায় রিগ্যাসিফিকেশন করা সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি। প্রথমে সীমিত পরিমাণে এবং পরে ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, “আশা করছি, আর কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হবে। টার্মিনালটি ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ করবে। গ্যাসের সরবরাহ পুনরুদ্ধার হলে বিদ্যুতের ওপর তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাহিদাও কমে আসবে।”

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ঝুঁকি

বিশ্বের জ্বালানি পরিস্থিতির দিকেও নাগরিকদের নজর রাখার আহ্বান জানান তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এলএনজির দিকে ঝুঁকেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চাহিদা ও দাম বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অস্থির উল্লেখ করে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সংকট দেখা দিলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর পড়বে।

তিনি বলেন, “সরকার তার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু সংকট যখন বৈশ্বিক, তখন তার কিছু প্রভাব আমাদের ওপর পড়ার ঝুঁকিও থাকে।”

এ কারণে জ্বালানি ব্যবহারে নাগরিকদের সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কিছু সংকট সবাইকে ভাগাভাগি করে মোকাবিলা করতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও সৌরবিদ্যুতে গুরুত্ব

দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকার কাজ করছে।

সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের সুফল পেতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সম্ভাব্য গ্যাস উৎপাদন পর্যন্ত যেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পগুলো সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সরকারকে মূল্যায়নের জন্য আরও কিছু সময় দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে জানানোর আহ্বান

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অতিরিক্ত বিল নিয়ে ঢালাও অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার আহ্বান জানান ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, কারও বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ বা অস্বাভাবিকভাবে বেশি এলে প্রথমে নিকটস্থ বিতরণ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ না করলে কিংবা অভিযোগ যাচাই করে কোনো জবাব না দিলে সেই বিষয়টিও প্রকাশ্যে জানানো যেতে পারে।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “প্রতিকার পাওয়া মানেই অভিযোগকারী সঠিক—এমন নয়। প্রতিকার মানে অভিযোগটি যাচাই করে একটি ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত দেওয়া। কেউ সেই সুযোগ না পেলে অবশ্যই আমাদের জানাবেন।”

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত বিল নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো নিয়ে মন্ত্রীও উদ্বিগ্ন এবং বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।

প্রিপেইড মিটারের পরীক্ষায় সমস্যা পাওয়া যায়নি

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বেও প্রিপেইড মিটার ও আগের মিটার পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা করা হয়েছে। সেসব পরীক্ষায় মিটারের মৌলিক ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।

তবে ব্যক্তি পর্যায়ে অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করা হবে বলে জানান তিনি।

মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ কেন প্রতি মাসে দিতে হয়—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এটি কোনো হিসাবের ভুল নয়; সরকারের বিদ্যমান নীতির আওতায় এসব অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, মিটার কেনার পরও ভাড়া এবং প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া যৌক্তিক কি না—এ প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর তার কাছে নেই বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের কাছে তুলে ধরে পরবর্তী ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করবেন।