শহীদের নামে হবে এলাকার সড়ক-প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি অপরাধের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী 

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের স্মৃতিকে ধরে করে রাখতে নিজ নিজ এলাকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সড়কের নামকরণ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে ঘটে যাওয়া প্রতিটি হতাহতের ঘটনার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারের শক্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি।

বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বহুল প্রত্যাশিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এবং সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা ও আহত যোদ্ধারা।  

স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারে বদ্ধপরিকর সরকার 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই বিগত সরকারের সময় হওয়া সব অপরাধের বিচার হওয়া অনিবার্য। তিনি বলেন, “আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেই বিচার হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য। প্রতিটি অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতেই আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে।” 

ইতিহাসের সততা ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আমাদের বীর জনগণের অকুতোভয় সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক রূপরেখা। এই জাদুঘর কেবল ২০২৪ সালের নৃশংস ঘটনার স্মারক হয়ে থাকবে না, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করবে।” 

ইতিহাস বিকৃতি এড়ানোর তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি— অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান কখনও ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না। বরং তা ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি করে। তাই জাদুঘরের প্রতিটি বিষয়ে যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।” 

একই সঙ্গে জাদুঘরের প্রদর্শনী ও বিবরণীগুলো বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন তিনি, যাতে বিশ্বের যেকোনও প্রান্তের মানুষ বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সত্য ইতিহাস জানতে পারে। 

‘ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা সভ্য জগতে বিরল’

গণঅভ্যুত্থান ও বিগত সময়ের দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, মামলা ও হামলায় ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছেন। আর কেবল জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান ঠেকাতেই তারা হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে নারী, শিশু ও ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে। পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন বর্বরোচিত নৃশংসতা সভ্য জগতে বিরল।” 

তিনি আরও যোগ করেন, “ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম-খুনকে একটি স্বাভাবিক নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই দেড় দশকের নৃশংসতার তুলনা কেবল স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই চলে।”  

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণের তাগিদ

স্মৃতি জাদুঘরে কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, “ইতিহাস সাক্ষী, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র কোনোদিনই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারেনি। এদেরই পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে একদলীয় শাসন এনে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। পরবর্তীতে স্বাধীনতাবিশেষজ্ঞ ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এসব সত্য ইতিহাস ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’ সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের অধিকার ও অতীত সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা পাবে।” 

স্মৃতি জাদুঘরটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একদিকে যেমন পূর্বসূরিদের বীরত্বের প্রতীক হিসেবে দাঁড়াবে, অপরদিকে বিতাড়িত অপশক্তির আসল মুখোশ উন্মোচন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।