‘আমি চাই, আমার ছেলের চিঠিটি জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হোক। আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক, কতটা আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের সন্তানরা এই ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশ গড়তে সক্ষম হয়েছিল।’ —জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে এভাবেই নিজের দাবি তুলে ধরেন জুলাই আন্দোলনে নিহত আনাসের মা। আনাস বাসা থেকে যাওয়ার আগে একটা চিঠি লিখে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা গণহত্যার ন্যায়বিচার, শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা আহতদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান বলেন, “দুই বছর আগে এই দিন, এই সময় আমার আনাস পৃথিবীতে ছিল। আনাস খুব স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী ছিল। তার মতো শহীদ ও আহত সন্তানের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকে আমরা এই ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশ পেয়েছি। আমি ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ, আমরা যেন এই গণহত্যার ন্যায়বিচার পাই। আমাদের এই ভিক্টিম পরিবারগুলোর জন্য যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়। জুলাই যোদ্ধাদের যেন যথাযথ রক্তের মূল্যায়ন করা হয়।”
আনাস বাসা থেকে যাওয়ার আগে একটা চিঠি লিখে গিয়েছিল জানিয়ে তিনি দাবি তুলে বলেন, “আমি চাই, আমার ছেলের চিঠিটি জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হোক। আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক, কতটা আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের সন্তানরা এই ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশ গড়তে সক্ষম হয়েছিল।”
নিহত আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, “আমার ছেলে শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাবো, ওই কলেজের লাইব্রেরিটি যেন আমার ছেলের নামে করা হয়। আমি তো আর আমার সন্তানকে ফিরে পাবো না। অন্তত ওই স্মৃতিটা দেখে মনে করতে পারবো, আমার ছেলে এই কলেজে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আরও অনুরোধ করবো, যেসব সন্তান এদেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, এদেশের জন্য স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তাদের যেন ন্যায্য বিচার ও সম্মান নিশ্চিত করা হয়। তাদের হত্যার বিচার যেন হয়। সেই ফ্যাসিবাদ যেন আর কোনোভাবেই এদেশে ফিরে না আসে। আমি তাকে (প্রধানমন্ত্রী) বলবো, জুলাই যোদ্ধা ও জুলাই শহীদ পরিবারগুলো যেন উপযুক্ত সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে। জুলাই যোদ্ধাদের চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক, তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।”
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়। আমরা নেমেছিলাম একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে। পরবর্তীকালে যখন এই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়, তখন আমরা অনেকেই নীরবে সরে দাঁড়িয়েছি। কারণ আমাদের বিশ্বাস, দেশের জন্য কাজ করতে পারাটাই আমাদের সম্মানের বিষয়। ব্যক্তিগত পরিচিতি বা স্বীকৃতির চেয়ে দেশের কল্যাণ আমাদের কাছে অনেক বড়।”
তিনি বলেন, “আজও রাষ্ট্রের কাছে আমার ব্যক্তিগত কোনও দাবি নেই। আমার একমাত্র প্রত্যাশা, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, মানুষের মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ আমি রাষ্ট্রের কাছে দুটি বিনীত দাবি জানাতে চাই। প্রথমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত এবং সকল সংগ্রামীকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সম্মান ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হোক। দ্বিতীয়ত, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও বাংলাদেশিকে ন্যায়বিচারের জন্য রাজপথে জীবন দিতে না হয়।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “জুলাই আমাদের শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি দেয়নি, এটি আমাদের একটি দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে। সেই দায়িত্ব হলো এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষিত তরুণ বেকার থাকবে না, যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতির সুযোগ ও জনভোগান্তি হ্রাস পাবে, পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং প্রতিটি মানুষ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবে। সবশেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই, জুলাই যেন ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে না থাকে; জুলাই যেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের প্রেরণা হয়ে থাকে।”