একসময় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছিল গণভবন। সময়ের পরিক্রমায় সেই গণভবনই এখন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। এখানে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে গুম, নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের নানা স্মৃতি ও নিদর্শন।
জাদুঘরে রয়েছে টর্চার রুম, গুমকক্ষ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অফিস, তার ব্যবহৃত ‘লাল টেলিফোন’, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) প্রযুক্তিতে গুমঘর দেখার ব্যবস্থা, জুলাই আন্দোলনের আলোকচিত্র এবং আন্দোলনে নিহতদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। পুরো জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে এমন চিত্রই দেখা যায়।
প্রবেশমুখেই আন্দোলনের স্মৃতি
জাদুঘরের মূল ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের প্রতীকী কবর। পাশের মাঠজুড়ে রয়েছে অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনার ভাস্কর্য। রয়েছে বিডিআর বিদ্রোহের স্মারক ভাস্কর্যও। মাঠ পেরিয়ে মূল ভবনে প্রবেশ করলে সামনে আসে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিভিন্ন ঘটনার প্রদর্শনী।
ভবনে ঢুকতেই দর্শনার্থীদের নজরে পড়ে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, টিউলিপ সিদ্দিকী, রাদওয়ান মুজিবসহ কয়েকজনের অর্ধেক করে কাটা মুখাবয়বের ভাস্কর্য।
এরপরই রয়েছে ‘টর্চার রুম। সেখানে প্রদর্শন করা হয়েছে নির্যাতনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন গুমকক্ষ থেকে উদ্ধার করা আলামত। রয়েছে টর্চার চেয়ার, চাবুক, ড্রিল মেশিন এবং এসএমজি অস্ত্রের ম্যাগাজিন।
পাশের কক্ষটির নাম ‘গুম’। সেখানে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পোশাক, জুতা, মোবাইল ফোন, চিঠি, বন্দিদশায় দেয়ালে লেখা বিভিন্ন বার্তা ও ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার অফিস ও ‘লাল টেলিফোন’
গুমকক্ষের পরেই রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অফিস কক্ষ। সেখানে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ছবি কাঠে খোদাই করে রাখা হয়েছে। কক্ষটির অন্যতম আকর্ষণ শেখ হাসিনার ব্যবহৃত ‘লাল টেলিফোন’।
কক্ষে তিনটি টেবিলে রাখা হয়েছে ছয়টি লাল টেলিফোন। প্রতিটি টেবিলের পাশে রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও ফোন নম্বরসংবলিত তালিকা। নির্দিষ্ট নম্বরে কল করলে বিভিন্ন অডিও কথোপকথন শোনানো হয়।
এর মধ্যে একটি নম্বরে কল করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যায়। আরেকটি নম্বরে শোনা যায় সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের সঙ্গে কথোপকথন, যেখানে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের বিষয়ে আলোচনা রয়েছে বলে প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লাল টেলিফোনের সামনে দাঁড়িয়ে অডিও শুনছিলেন তেজগাঁও থেকে আসা দর্শনার্থী শহীদুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিভিন্ন নম্বরে কল করে বিভিন্ন কথোপকথন শুনলাম। কোথায় কী করতে হবে, কার সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে—এসবই শোনানো হচ্ছে।”
ভিআরে গুমঘর
এই অংশের বাইরে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) প্রযুক্তিতে গুমঘর দেখার ব্যবস্থা। পাশাপাশি রয়েছে গুমকক্ষের একটি মিনিয়েচার মডেল।
রাজনৈতিক নিপীড়নের বিভিন্ন অধ্যায়
জাদুঘরের নিচতলার আরেকটি অংশে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিপীড়ন, বিডিআর বিদ্রোহ এবং শাপলা চত্বরের ঘটনার বিভিন্ন আলামত, সংবাদপত্রের কাটিং, টেলিফোন কথোপকথন ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। কিছু অডিওতে সেনাসদস্যদের আর্তনাদও শোনা যায়।
এ ছাড়া বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর নির্যাতনের চিত্র এবং ছাত্রলীগের সহিংসতার বিভিন্ন তথ্যও আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সাবেক গণভবনের অডিটোরিয়ামে জুলাই আন্দোলনভিত্তিক বিভিন্ন তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় জুলাইয়ের ৩৬ দিন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আবাসিক অংশ হিসেবে ব্যবহৃত দ্বিতীয় তলাটি পুরোপুরি উৎসর্গ করা হয়েছে জুলাইয়ের ৩৬ দিনের আন্দোলনকে।
এখানে আন্দোলনে নিহতদের ব্যবহৃত পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং জুলাইয়ের প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহ ছবি ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় প্রবেশের পর প্রথমেই দেখা যায় আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন এবং প্রবাসীদের প্রতিবাদের ভিডিওচিত্র।
যেখানে আন্দোলনকারীদের ব্যবহৃত সামগ্রী প্রদর্শন করা হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট ভিডিওচিত্রও একসঙ্গে দেখানো হচ্ছে।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি আন্দোলনে নিহত নাফিজকে বহনকারী রিকশাটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে জাদুঘরে।
গণভবনের পুরোনো লাইব্রেরি আগের মতোই রাখা হয়েছে। সেখানে জুলাই আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বই রাখা হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের বসে পড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
যা বলছেন দর্শনার্থীরা
জাদুঘর ঘুরে দেখে মোহাম্মদপুর থেকে আসা শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “জুলাই আন্দোলন আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। এখানে এসে আন্দোলনের বিভিন্ন নিদর্শন সামনে থেকে দেখে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হয়েছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”
সাভার থেকে আসা মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “জাদুঘরটি ভালো লেগেছে—এভাবে বললে পুরো অনুভূতি প্রকাশ করা হবে না। বরং বলতে চাই, এখানে এসে কষ্ট লেগেছে। শহীদদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে বুকটা ভার হয়ে এসেছে।”
মিরপুর থেকে ঘুরতে আসা মো. হাসান বলেন, “২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আয়োজনটি সুন্দর হয়েছে।”
সাভার থেকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসলাম হোসেন বলেন, “জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর বিভিন্ন স্মৃতি এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, কোথায় কী ঘটেছিল—সেসবের নানা নিদর্শন মানুষ এখন দেখতে পাচ্ছে।”
রাজধানীর বনশ্রী থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জাদুঘর দেখতে আসা নার্গিস রায়হান দ্বিতীয় তলা ঘুরে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এত কিছু দেখার পর খুব খারাপ লেগেছে।”
‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর একটি চলমান জাদুঘর’
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “জুলাই স্মৃতি জাদুঘর একটি চলমান জাদুঘর। এটি সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে কাজ করছে। আমরা এখনও সেই ইতিহাসের মধ্যেই আছি। গবেষণার মাধ্যমে নতুন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে জাদুঘরে যুক্ত করা হবে।”
তিনি বলেন, “জাদুঘরের নকশাও সেই ধারণা থেকেই করা হয়েছে। আমরা একে ‘ওয়ার্কিং ইন প্রগ্রেস’ জাদুঘর বলছি। নতুন গবেষণা ও তথ্য যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও সমৃদ্ধ হবে।”
তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানান, শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ নয়, এর পেছনের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সে কারণে নিচতলায় গত ১৬ বছরে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিভিন্ন দিক স্থান পেয়েছে। অপরদিকে দ্বিতীয় তলায় তুলে ধরা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ। পাশাপাশি ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ শিরোনামের একটি প্রদর্শনীতে ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও উপস্থাপন করা হয়েছে।
শহীদদের স্মারক সংগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ শহীদের বিভিন্ন নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে সবগুলো একসঙ্গে প্রদর্শন করা সম্ভব নয়। তাই প্রতি তিন মাস পরপর রোটেশন পদ্ধতিতে নিদর্শনগুলো প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০ শহীদের ব্যবহৃত সামগ্রী প্রদর্শিত হচ্ছে।’
প্রথম দিনের দর্শনার্থী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আজ ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। অনলাইনের টিকিটও ১৪ আগস্ট পর্যন্ত বিক্রি হয়ে গেছে। সব তথ্য একত্র করার পর দর্শনার্থীর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।”
সকালে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিয়ে কিছুটা বিশৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি বলেন, “ভবনের ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ায় স্লটভিত্তিক প্রবেশের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রথম দিন হওয়ায় আগ্রহ বেশি থাকায় অনেকেই তা মানেননি। আপাতত এটি একটি পরীক্ষামূলক পর্যায়। ধীরে ধীরে সবাই নিয়মের মধ্যে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। তখন পুরো প্রক্রিয়াই আরও সুশৃঙ্খল ও সহজ হবে।”