দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
১৯৯১ সালের পর দেশে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোনোবারই ভোটের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একজন প্রার্থী থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে
গত ২৪ জুলাই বিকালে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি ছিলেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি। জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচন পরিচালিত হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী।”
তিনি জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিজেই নির্বাচনি কর্তা বা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এর আগে গত ২৮ জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। আর ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ইসি জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও অন্যান্য প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
১৯৯১ সালে হয়েছিল সর্বশেষ ভোট
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এরপর ওই বছরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে ভোটাভুটি হয়।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।
ভোটে আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে আর ভোটের প্রয়োজন হয়নি। একক প্রার্থী থাকায় প্রত্যেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনই এখন পর্যন্ত দেশের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এবার প্রার্থী কারা
ক্ষমতাসীন বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারদলীয় এক হুইপ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখন পর্যন্ত আমাদের দল থেকে দুটি ফর্ম সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী ১৩ আগস্ট পর্যন্ত আরও কয়েকটি নেওয়া হতে পারে। তাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাচ্ছেন, তা জানতে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দলীয় আরও কিছু প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। সময় হলে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম প্রকাশ করা হবে।”
অপরদিকে, রবিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা কী
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ১ দফায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
একই অনুচ্ছেদের ৪ দফা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি— ৩৫ বছরের কম বয়সী হন; সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন; অথবা সংবিধানের অধীন অভিশংসনের মাধ্যমে কখনও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর যোগ্যতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত রয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকেও সেগুলো পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হবে।”
কীভাবে হবে নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এ জন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনি কর্তা এতে সভাপতিত্ব করবেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। একই সঙ্গে মনোনীত ব্যক্তির সম্মতিসূচক বিবৃতিও দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হবেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। নির্বাচন কমিশন এ জন্য ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে নির্ধারিত দিনে সংসদ কক্ষে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হবে। ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে।
সর্বোচ্চ ভোট একাধিক প্রার্থী সমানভাবে পেলে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি কর্তার ঘোষিত ফলাফলই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
যদিও সংসদে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত।