জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত যোদ্ধারা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ের সাহসী অংশীদার বলে মন্তব্য করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি বলেন, পর্যটন করপোরেশনের হোটেলগুলোতে ৩৬ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়া হবে জুলাই যোদ্ধাদের। বিমানের টিকিটে তাদের বিশেষ মূল্যছাড় দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান ও আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
পর্যটনমন্ত্রী বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করলেই হবে না। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান এবং আহত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
মন্ত্রী বলেন, যে মা সন্তান হারিয়েছেন, যে বাবা তার কাঁধে সন্তানের লাশ নিয়েছেন, তারাই জানেন সন্তান হারানোর কষ্ট কেমন। আপনাদের অবদানের কারণেই আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। দেশকে ফ্যাসিস্টের দুঃশাসন থেকে রক্ষা করেছেন আমাদের জুলাই যোদ্ধারা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান।
পর্যটনমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন খাত দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে পর্যটন খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, জনবান্ধব, নিরাপদ, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ৩৬ জুলাইকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য পর্যটন করপোরেশনের হোটেলগুলোতে ৩৬ শতাংশ ডিসকাউন্ট প্রদান করা হবে জুলাই যোদ্ধাদের। তাদের কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা করা হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটে বিশেষ মূল্যছাড় দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। আন্দোলনের শেষের দিকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য বিগত সরকার আমাকেসহ বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে জেলে বন্দি করেছিল। ৩৭ জুলাই আমি মুক্তি পাই। আন্দোলনে আমরা যদি জয়ী না হতাম, তাহলে আজকে আমরা এই অবস্থানে থাকতাম না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্দোলনকালীন সময়ে একটা সেল গঠন করেছিলেন আমরা বিএনপি পরিবার নামে। সেই সেলের একজন গর্বিত সদস্য আমি নিজেই। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। ২৪-এর আন্দোলনে আমাদের সার্বভৌমত্ব ফিরে পেয়েছি। তাই ২৪ এর যোদ্ধাদের আমি জানাই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সূচকে পরিমাপ করা যায় না; মানুষের মর্যাদা, অধিকার, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য। আমাদের পর্যটন স্পটগুলোতে জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থায় জুলাই যোদ্ধাদের চাকরি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ আমাদের সামনে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পণ করেছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় মানুষের প্রত্যাশা, বৈষম্যহীন সুযোগ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই আমাদের উন্নয়নকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী করতে হবে। বর্তমান সরকার জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যস্ত আছে, জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেওয়ার দৌঁড়ে নেই। আমাদের সকলের দায়িত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে পালন করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, জুলাই শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের সম্মান জানানো বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের জন্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি আমাদের কৃতজ্ঞতা, দায়বদ্ধতা ও জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এমন একটি পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে কাজ করবে, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করবে এবং বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্ববাসীর কাছে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরবে। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ আমাদের সেই দায়িত্ব পালনে আরও দৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিবৃন্দ বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পক্ষ থেকে শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্য এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের হাতে প্রাইজবন্ড ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন। এ সময় অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে পাঁচজন শহীদ জুলাই যোদ্ধার পরিবারের সদস্য এবং পাঁচজন আহত জুলাই যোদ্ধা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, বেসরকারি পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।