সরকারের ১৮০ দিন: উদ্যোগ অনেক, বাস্তবায়নে বড় পরীক্ষা

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, গ্যাসের অপর্যাপ্ততা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক ধীরগতির মতো একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জের মধ্যে ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। তবে এই সময়ের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের দৃশ্যমান তৎপরতাও রয়েছে।

নীতিগত অনেক উদ্যোগের সুফল এখনও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। তবে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো আগামী দিনের কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করছে। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, জননিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরদিনই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন তারেক রহমান। ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার মতো এক নাজুক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পায় নতুন সরকার।

এসব সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন এবং মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনকে নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন। ছুটির দিনেও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা, দেশজুড়ে উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সরকারে গতির সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোগ

প্রথম ছয় মাসে সরকারের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতের কিছু উদ্যোগ। নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ চালু, কৃষিঋণ মওকুফ, খাদ্য মজুত বৃদ্ধি, তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নতুন কর্মসূচি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের বোঝা না বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় বাজেট পেশ করাকে বড় পদক্ষেপ মনে করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করাকে সাফল্যের তালিকায় রাখছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের মতো প্রকল্প সামনে আনা হয়েছে।

ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকার ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত ও বাস্তবমুখী সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্টরা। বিনিয়োগকারীদের নতুন আগ্রহকেও অর্থনীতির প্রতি আস্থার লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০ বছরের অপশাসনের’ পর দায়িত্ব নিয়ে সরকার প্রথম থেকেই সংকট নিরসনে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ‘ছয় মাস খুব অল্প সময়। আমরা আশা করি আগামী ছয় মাসে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সামনে আরও কাজ

এতসব উদ্যোগের পরও জীবনযাত্রার ব্যয় সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাজারে তার কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি মেলেনি। পাশাপাশি গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা।

গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, গ্যাস পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছিল। সরকার এটি সমাধানে কাজ করছে। আশা করছি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সংকট কেটে যাবে।

ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের কাজ

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কার সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আস্থা সংকটে জর্জরিত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ শুরু হলেও তাতে গতি আসেনি।

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ

সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। তবে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল পাওয়া কঠিন।

ফলে আগামী ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ

সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনের সব স্তর প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেখানো গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারছে না বলে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগের গতি কমে গেছে।

তাদের মতে, এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজ করার সদিচ্ছা নয়; সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও জরুরি।

রাজনৈতিক সমন্বয় সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ

সরকারকে এখনও বেশ কিছু অমীমাংসিত রাজনৈতিক বিষয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক মিত্ররা মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, সংবিধান সংস্কার এবং আগের সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে আরও সক্রিয় যোগাযোগ প্রয়োজন।

তাদের মতে, ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি যে ‘রেইনবো নেশন’ বা ‘রংধনু জাতি’র ধারণার কথা বলেছিল, রাষ্ট্রের কাঠামো ও কার্যক্রমে তার আরও দৃশ্যমান প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুর রাজ্জাক খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ডে তিনি সন্তুষ্ট নন।

তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ডে আমি সন্তুষ্ট নই। ৫ আগস্টের পর যে সমস্যাগুলো ছিল, এর মধ্যে মব সহিংসতাও রয়েছে, সেগুলো বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি–সংকট মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।’

তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। তবে সেই প্রত্যাশার পুরোপুরি প্রতিফলন এখনও বাস্তবে দেখা যায়নি।

আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, ‘এই সরকারের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনও সেগুলোর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। তবে ছয় মাস খুবই অল্প সময়। আগামী ছয় মাসে সরকার কী করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় জরুরি সেবা প্রদান এবং দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে বাজেট ঘোষণা করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তবে তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ ও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।