ভোটকেন্দ্রে নিহত শিশুর বাবাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি

শুভ কাজীকেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের ঢালিকান্দি এলাকার মধুচরে ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শিশু শুভ কাজীর (৯) বাবাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন সন্ত্রাসীরা। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতা নতুন ইউপি চেয়ার‌ম্যানও হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারীদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত শুভর বাবা হালিম কাজী শুক্রবার বিকেলে বাংলা ট্রিবিউনকে অভিযোগ করেন, ‘আসামিরা বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন। আমি বর্তমানে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছি। তারা কখন কী করে সেই ভয়তেই থাকি।’

তিনি বলেন, ‘আমি ১২ জনকে আসামি করে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছি। যাদের আসামি করেছিলাম তারাই বিভিন্নভাবে ফোন করে আমাকে হুমকি দিচ্ছেন।’

এ ঘটনায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা হলেও তাতে কারও নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি। তবে পুলিশ স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজনের নাম জানতে পেরেছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদাউস হোসেন। নিহত শিশুর বাবাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এমন কথা তাদের জানা নেই বলেও জানান ওসি।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বাড়ি ওই এলাকাতেই। তিনি প্রতিদিনই খবর নিচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘হামলাকারীরা সবাই বহিরাগত। তাদের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন ছিলেন যারা গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে তাদের গ্রেফতার করা হবে। কেউ ছাড় পাবে না।’

গত ৩১ মার্চ সকালে হযরতপুর ইউনিয়নের ঢালিকান্দি এলাকার মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে নয় বছরের শিশু শুভ কাজী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়। শুভ ওই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা হালিম কাজী অটোরিকশা চালক। দুই ভাই-বোনের মধ্যে শুভ ছিল বড়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, হত্যাকারীরা আওয়ামী লীগের মনোনীত নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নালের কর্মী। তার অনুসারী রানা মোল্লার নেতৃত্বে ওই ভোটকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়।

ভোটকেন্দ্রে শিশু শুভ কাজীকে (৯) গুলি করে হত্যার বিচারের দাবিতে কেরানীগঞ্জের হযরতপুরের সব শ্রেণির মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে এলাকাবাসী একট্টা হয়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করছে। তবে এখনও গ্রেফতার হয়নি শুভর হত্যাকারীরা।

আরও পড়ুন: ৮ হাজার আল কায়েদা জঙ্গির কথা জানালেন তথ্যমন্ত্রী

এদিকে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নাল শুভর বাবাকে গাড়ি কিনে দেওয়ার কথা বলে মীমাংসার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে হযরতপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর মোড়ে শুভ হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন হয়। এতে এলাকার নারী ও শিশুসহ সব শ্রেণির মানুষ অংশ নেয়। এ সময় এলাকাবাসী শুভ হত্যার বিচারের দাবিতে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করে।

নিহতের বাবা হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৪০ থেকে ৫০ জন একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তাদের প্রত্যেকের বুকে নৌকার ব্যাজ লাগানো ছিল। এদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ জনের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা গুলি করতে করতে বের হয়। কিন্তু কোনও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে দেখলাম না। তারা কাদের গুলি করে তাও বুঝতে পারিনি। গোলাগুলি যখন শুরু হয়, আমি তখন দৌড়ে বের হয়ে আসি। ভোট দেইনি। এ সময় ভোটকেন্দ্রে ৩ থেকে ৪ জন পুলিশ ছিলেন। তারা স্কুলের গেটে তালা দিয়ে দোতলায় বসে ছিলেন। এক মিনিটের মধ্যে ভোটকেন্দ্রটি খালি হয়ে যায়। এরপর শুনি আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি সিএনজি নিয়ে শিকদার মেডিক্যালে যাই। গিয়ে শুনি ছেলে আমার বেঁচে নেই।’

আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নালের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর তিনি কয়েকবার আমার কাছে এসেছেন। আমাকে গাড়ি কিনে দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি এসব কথা কেন বলেন আমি জানি না। আমার ছেলে মারা গেছে, আমি গাড়ি দিয়ে কী করব? আমার এসবের দরকার নাই। আমি তাদের বলে দিয়েছি, তারপরও তারা সকাল-বিকাল আমার বাড়ি এসে বসে থাকেন।’

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে আইএস’র অস্তিত্ব নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

/এজে/