নতুন বেতন কাঠামো ও জ্বালানি সংকট নিয়ে যা জানালেন উপদেষ্টা তিতুমীর

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে এবং কত ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে—সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে ঋণের ব্যবহার, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেন তিনি।

বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে দুই ধাপ শেষ

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, সাধারণত বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি পর্যায়ে কাজ হয়। প্রথম পর্যায়ে পে সার্ভিস কমিশন, সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পে কমিটি এবং বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল পে কমিশন তাদের প্রতিবেদন দেয়। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে প্রথম দুটির বিষয়ে সচিব কমিটি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে।

বিচার বিভাগের বেতন কাঠামোর বিষয়েও মন্ত্রিপরিষদ গঠিত একটি কমিটি কাজ করছে। ওই কমিটির প্রথম সভা ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, বেতন কাঠামোর সংবেদনশীলতা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেবে।

এরপর তৃতীয় পর্যায়ে মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে। কোন বিষয় কখন এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেই হবে বলে জানান তিতুমীর।

তিনি বলেন, ‘কাজ চলছে। মন্ত্রিপরিষদ শিগগিরই সব ঠিক করবে।’

প্রায় ২০ লাখ মানুষের ওপর প্রভাব

নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাবের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে মূল বেতনভোগী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। পেনশনভোগীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের যুক্ত করলে এর আওতায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ আসতে পারেন।

মূল্যস্ফীতির চাপের বিষয়টিও সরকার বিবেচনায় নিচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে বড় মাত্রায় বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

তবে বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা সরকার দিচ্ছে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি কার্যকর ও যুক্তিসংগত ব্যবস্থা তৈরি করা।

বেতন কাঠামোতে কারা কতটা সুবিধা পাবেন—এ প্রসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন সরাসরি তুলনা না করার পরামর্শ দেন তিতুমীর।

তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতের ব্যয় বা বেতন তুলনার ক্ষেত্রে একই ধরনের বিষয়কে একই ধরনের বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বেতন এবং বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। তাঁর মতে, ‘যার কর্ম অনুযায়ী তার ব্যবস্থা’—এই নীতিই বিবেচনায় রাখা উচিত।

বেতন দিতে ঋণ নিলে সমস্যা নেই, নজর দিতে হবে সুদ ও ফলাফলে

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকার ঋণ নেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ঋণ নেওয়া নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং ঋণ কতটা যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ঋণ ছাড়া কি কোনও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চলে? ঋণ কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে বাজেট-ঘাটতি কত শতাংশ হলো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কত শতাংশ কর আদায় হচ্ছে।

তার মতে, জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় কত ব্যয় হচ্ছে, নীতিকাঠামো ও রাজস্বনীতি বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারছে কি না এবং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কিনা—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ফল কী হবে, অর্থের সময়মূল্য কত এবং ঋণের তাৎক্ষণিক বহুমাত্রিক প্রভাব কী—এসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, দেখতে হবে কত সুদে, কার কাছ থেকে, কত দিনের জন্য তা নেওয়া হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়ানোর ওপর জোর

দেশের অর্থনীতিতে অতীতে তথ্যের বিভ্রান্তি ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিতুমীর। তাঁর ভাষায়, ‘মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, ভুল তথ্য—এগুলো ছিল এত দিন।’

এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে অভ্যন্তরীণ করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তার বক্তব্যে উঠে আসে দেশের উন্নয়ন নিয়ে অতীতে তৈরি হওয়া বয়ানের সমালোচনাও। তিনি বলেন, পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে যখন ঋণের সুদ ব্যয় সামনে এসেছে, তখনও দেশে উন্নয়নের বিভিন্ন বয়ান প্রচারিত হয়েছে। কেউ একে ‘উন্নয়ন মিরাকল’, আবার কেউ ‘উন্নয়ন প্যারাডক্স’ বলেছেন।

তিনি বলেন, এমন সময়ও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যখন দেশে খাদ্য আমদানি করা হচ্ছিল, অথচ সংবাদে খাদ্য রপ্তানির কথা বলা হয়েছিল। তাঁর মতে, এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই দেশ এগিয়েছে।

শীতেই জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তির আশা

এদিকে আগামী শীত মৌসুমে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা। তার মতে, শীতকালে জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তি আসবে এবং গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

একইসঙ্গে ২০২৯ সালের মধ্যে বড় আকারের অর্থনীতির প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি কার্গো না আসার বিষয়ে তিতুমীর বলেন, বিষয়টি সবার জানা। সেখানে ‘ফোর্স মেজারস’ বা অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর অভিঘাত তুলনামূলক বেশি পড়ছে।

জ্বালানির বাফার মজুত তৈরির পরিকল্পনা

বর্তমান সংকটের অন্যতম শিক্ষা হিসেবে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, অতীতে প্রয়োজনীয় মজুত রাখা হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকটের মাত্রা এতটা হতো না। এখন সরকার এ ঘাটতি দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চাল ও গমের নির্দিষ্ট পরিমাণ বাফার মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। একইভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট মজুতের মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক সংকট, সরবরাহে বিঘ্ন বা আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হলেও যাতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা না লাগে, সে জন্য এই মজুতব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

কাতারসহ বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে

বর্তমানে এলএনজি সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উৎস এবং বিকল্প পরিবহন পথ বিবেচনা করছে বলে জানান তিতুমীর।

কাতারের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কাতারও কিছুটা ‘ফোর্স মেজারস’-এর মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে।

কাতারের পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। কোন উৎস থেকে, কোন মুদ্রায় জ্বালানি কেনা হবে এবং এর অর্থায়ন কীভাবে হবে—এসব বিষয়ও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন উদ্যোগ

দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা। তাঁর মতে, অতীতে গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একইভাবে দেশের সম্ভাব্য কয়লা সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল।

এখন দেশের সমুদ্রসীমায় নতুন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ব্লক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর নাগাদ অনুসন্ধান ব্লকগুলোর বিষয়ে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

বিদ্যুৎ খাতে ‘নো পাওয়ার, নো পে’ নীতি

জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এমন চুক্তি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দেশের ওপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ না পড়ে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন নীতির কথা তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা। এ ক্ষেত্রে ‘নো পাওয়ার, নো পে’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে তার জন্য অপ্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধের দায় যাতে সরকারের ওপর না পড়ে, ভবিষ্যৎ চুক্তিতে সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

সব মিলিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, সরকারি ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেমন মন্ত্রিসভা নেবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মজুত বাড়ানো, দেশীয় অনুসন্ধান এবং বিকল্প আমদানি উৎস তৈরির দিকেও এগোচ্ছে সরকার।