শপথ নিলেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তিনি। তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

শপথ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিকাল থেকেই বঙ্গভবন এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন সড়কে ডাইভারশন রাখা হয়েছে। যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (ছবি: প্রধানমন্ত্রীর ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া)

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে এই শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়।

এর আগে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনের সামরিক সচিব এবং অন্যান্য সচিবরা অভ্যর্থনা জানান এবং ভিভিআইপি-১ আসনে নিয়ে যান। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি একসঙ্গে দরবার হলে প্রবেশ করলে রাষ্ট্রপতির আগমনী সুর বাজিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভ্যার্থনা জানানো হয় এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

রাষ্ট্রপতির আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ছবি: পিএমও)

অতিথিদের আসন গ্রহণের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে পবিত্র কোরান তেলওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু করেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন উপস্থিত অতিথিদের সামনে উপস্থাপন করেন এবং স্পিকারকে (ভারপ্রাপ্ত) নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করানোর অনুরোধ জানান। 

এরপর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথবাক্য পাঠ করেন। শপথে তিনি বলেন, ‘আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে আমি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ 

নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানান এতদিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

শপথ গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপতি ও বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি পরস্পরের আসন পরিবর্তন করেন এবং স্পিকার ও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি শপথ-সংক্রান্ত নথিতে সই করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও নতুন রাষ্ট্রপতি ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে নতুন রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ পাঠ করান।

প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী ও দলটির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ভোটার তালিকাভুক্ত ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ভোট দেন ৩৪৩ জন।

ভোট গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে। না শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে।

রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। এর আগে তিনি ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে আলমগীরকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আলমগীর তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি নবম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হন।

ছাত্র আন্দোলন

মির্জা ফখরুল ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন তার রাজনৈতিক অভিযান শুরু করেন। সেই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান তুঙ্গে ওঠার সময়, সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেফতার এবং কারাগারে পাঠানো হয়।

শপথ অনুষ্ঠান

জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ

ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুলকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।

প্রাথমিক জীবন

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণকারী ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে, তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকায় একটি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। এই দম্পতির দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা। ছবি: পিএমও

মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি পদে আছেন। তিনিও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন।

তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ছিলেন। ঠাকুরগাঁও নির্বাচনি এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির রাজনীতিবিদ, যিনি ভূমিমন্ত্রী (১৯৭৮-৭৯), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী (১৯৯১-৯৬) এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার (১৯৭৯-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মির্জা হাফিজ ১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মির্জা ফখরুলের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর প্রবাস সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য নবগঠিত যুব শিবির অধিদফতরের প্রধান হিসেবে তাকে মনোনীত করা হয়েছিল।