ঘটনাস্থল মুম্বাইয়ের ন্যাশনাল মেরিটাইম সামিট, যার উদ্বোধন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে নামে ন্যাশনাল হলেও ভারতের সমুদ্র-অর্থনীতির স্বার্থে যেসব দেশের সঙ্গে দিল্লি নতুন সমীকরণ গড়তে চাইছে তাদের মন্ত্রী-কর্মকর্তারা যোগ দিয়েছেন এই সম্মেলনে। আর সে কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মরিশাস, সুদান, সেশেলসসহ বিভিন্ন দেশের শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন এই সম্মেলনে। বেশ বড় মাপের প্রতিনিধিদল নিয়ে মুম্বাই এসেছেন বাংলাদেশের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। বাংলাদেশকে যে এই সম্মেলনে ভারত আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছে তা স্পষ্ট হয়েছে নীতিন গডকড়ির কথায়। আর এই বাড়তি গুরুত্বের প্রধান কারণ হচ্ছে পায়রা বন্দর।
বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, শুক্রবার সকালে মুম্বাইয়ে বিদেশি প্রতিনিধিদের সামনে ভারতের জাহাজমন্ত্রী যে ছবিটা তুলে ধরেছেন তার মূলে ছিল ‘সাগরমালা’ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম হাব (সমুদ্রঘাঁটি) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য ভারত যে উচ্চাভিলাসী প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার কেন্দ্রে আছে এই সাগরমালা অর্থাৎ ভারতের উপকূল ঘেঁষে প্রধান বন্দরগুলো ঘিরে অর্থনীতির একটা নতুন রূপরেখা তৈরি করা। ভারতের উপকূলরেখার আউটলাইনটা যেহেতু একটা মালার মতো দেখতে তাই এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাগরমালা’। আর মুম্বাই, ম্যাঙ্গালোর, কোচিন, তুতিকোরিন, চেন্নাই, ভাইজাগ বা পারাদ্বীপের মতো বন্দরগুলো এই মালার এক একটি ফুল!
তবে বাংলাদেশের তটরেখার কাছে এসে এই মালাটা যেন একটু ছেঁড়া ছেঁড়া দেখাচ্ছে , কারণ ওখানে ভারতের তটরেখা শেষ, আর বাংলাদেশের শুরু। কিন্তু সাগরমালার চেহারাকে সম্পূর্ণ করে তুলতে বাংলাদেশের মংলা, চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজারকেও এই মালার অংশ করে তোলাটা জরুরি বলে মনে করছে ভারত। সেই উদ্দেশ্যে প্রস্তাব দিচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের। সেটাই হল পটুয়াখালীর পায়রা।
শুক্রবার মুম্বাইতে প্রেজেন্টেশনের পর বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন নীতিন গডকড়ি ও তার কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সেখানে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল খালিদ ইকবাল, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। বৈঠকে নীতিন গডকড়ি তাদের বুঝিয়েছেন ভারত পায়রাতে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে তুলতে পারলে তাতে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সাগর-অর্থনীতির চেহারা বদলে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিন গডকড়ি পায়রা নিয়ে রীতিমতো হোমওয়ার্ক করেই এসেছিলেন। সম্প্রতি ভারতের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের উপকূলীয় ওই অঞ্চলটি ঘুরেও এসেছে। তাদের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই তিনি তৈরি করেছিলেন তার প্রেজেন্টেশন। বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, মেরিটাইম সামিট শেষ হওয়ার পর আগামী সপ্তাহেই ভারতের জাহাজ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে আরেকটি দল ওই অঞ্চলে সফরে যাবে। বাংলাদেশের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান তাদের সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
গত এক বছরের মধ্যে ভারতের মরিশাসের প্রত্যন্ত আগালেগা দ্বীপটির কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হয়ে উঠতে পারে। একই কারণে সেশেলসের অ্যাসাম্পশন দ্বীপটিও লিজ নিয়েছে ভারত। দিনচারেক আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টকে কথা দিয়েছেন সেখানেও দুটো দ্বীপে ভারত বন্দরের সুযোগ-সুবিধা গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলকে এই সব তথ্যও দেওয়া হয়েছে। পায়রা বন্দর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতের দক্ষতা ও সামর্থ্য চীনের চেয়ে যে কম নয় তা বোঝাতেই এটা করা হয়েছে।
এটা এখন স্পষ্ট যে, পায়রাতে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনও রীতিমতো উৎসাহী, এর আগে দেশটি শ্রীলঙ্কাতে হামবানটোটা বন্দর তৈরি করার সময় ভারতকে টেক্কা দিয়েছিল। তবে পায়রা নিয়ে শেষ কথা বলবে অবশ্যই বাংলাদেশ সরকার। তার পরেই স্থির হবে পটুয়াখালীর এই প্রত্যন্ত জনপদ ভারতের সাগরমালার অংশ হবে, নাকি চীনের অনুরূপ প্রকল্প ‘স্ট্রিং অব পার্লসে’র একটি মুক্তো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে?
/এমএসএম/