সংসদে হইচই, তোপের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে জাতীয় সংসদে তোপের মুখে পড়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সদস্যরা ইই চই শুরু করলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বারবার সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে অনুরোধ করলেও বেশ কিছুক্ষণ হই চই চলতে থাকে। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হলে স্পিকার তাকে ধন্যবাদ জানান এবং বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে পরিস্থিতির অবসান হয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্নোত্তরের সময় এ ঘটনা ঘটে।


দিনে-দুপুরে ছিনতাই এবং এমপিদের ওপর হামলার অভিযোগ

পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, দিনে-দুপুরে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই ও রাহাজানি হচ্ছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা হচ্ছে। সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হলেও আসামিদের গ্রেফতার না করে উল্টো বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি জানতে চান, প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই-রাহাজানি এবং সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
 
‘শাহবাগে বক্তৃতা আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা এক নয়’
 
জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শাহবাগে গিয়ে বক্তৃতা, আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা এক কথা নয়।’ তার এ মন্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ ও হইচই শুরু করেন।

পরিস্থিতির মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে বলিনি। আমি তো আপনারা কথা বলার সময় কথা বলিনি! মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার শেল্টার চাচ্ছি।’ এ সময় স্পিকার বিরোধীদলের সদস্যদের শান্ত হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার আহ্বান জানান। কিন্তু স্পিকারের অনুরোধের পরও হইচই চলতে থাকে।

একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইয়েস, আই উইথড্র! ঠিক আছে?’

সদস্যদের বারবার বসার অনুরোধ স্পিকারের

এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, আপনারা অনুগ্রহ করে বসুন। অনুগ্রহ করে নিজ নিজ আসনে বসুন। কথা বলার তো অনেক সুযোগ আপনাদের দিচ্ছি। এভাবে ঢালাও না বলে মাইকে বললে তো সবাই শুনতে পায়। আপনাদের সুযোগ দেওয়া হবে। যখন সুযোগ পাবেন, মাইকে বলবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে আপনাদের বিরোধীদলের চিফ হুইপ দাঁড়িয়েছেন, সামনের সারির সদস্যরা দাঁড়িয়েছেন, তখন অনুগ্রহ করে পেছনের সারি থেকে বক্তব্য দেবেন না। আপনাদের নেতারা কী বলেন, সেটা শোনার চেষ্টা করবেন। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। প্রচুর সুযোগ আছে আপনাদের জন্য। এই সংসদে বক্তব্য দেওয়ার প্রচুর সুযোগ আছে।’

সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করে স্পিকার বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছামতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন।’

‘স্পিকারের কথা বলার সময় যে জোশ দেখাচ্ছেন, এটা সংসদীয় কাজ নয়’

এরপরও হইচাই চলতে থাকলে স্পিকার বলেন, ‘বসুন, প্লিজ অপেক্ষা করুন। আপনাদের স্পিকারের আসন থেকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে, অনুগ্রহ করে বসুন।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা তো উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাবেন। শোনেন, আপনারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্তর শুনুন। তারপর যদি প্রয়োজন হয়, আপনারা বলতে পারবেন।’

একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এই যে স্পিকারের কথা বলার সময় যে জোশটা আপনারা দেখাচ্ছেন, এটা সংসদীয় কাজ নয়। সংসদে সংসদের রীতিনীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আপনাদের কাছ থেকে আমি সহযোগিতা কামনা করছি।’

‘আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলবেন, পরে বিরোধীদলীয় নেতা’

হইচইয়ের মধ্যেই স্পিকার স্পষ্ট করে দেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আগে তার বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দিতে হবে। এরপর বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ফ্লোর দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন, তারপর আমি বিরোধীদলের নেতাকে দেবো। আপনি বসুন। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনি বক্তব্য দেন। তারপর আপনি বলবেন। বিরোধীদলের নেতা, অপেক্ষা করুন—তার বক্তব্যটা শেষ করুন। তারপর আপনি বলবেন। আপনাকে ফ্লোর দেবো।’

স্পিকার আরও বলেন, ‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, প্রশ্নোত্তরের সময় একজন মন্ত্রীকে যদি উত্তর দিতেই আপনারা না দেন, উত্তর উনি দিন। তারপরে যদি উত্তর পছন্দ না হয়, আমি বিরোধীদলের নেতাকে মাইক দেবো।’

একপর্যায়ে স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন। সংক্ষেপে প্রশ্নের উত্তর দিন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বলেন, ‘আমি আপনার দিকেই তাকিয়ে কথা বলি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার যে শব্দ চয়ন তাদের আপত্তি আছে। তার জবাব আমি দিতে পারবো। মাননীয় স্পিকার আপনি আমাকে যদি কথা বলতে না দেন, তাহলে কীসের বাকস্বাধীনতা।’

‘সম্পূরক প্রশ্নও স্পেসিফিক করতে হবে’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমাদের এখানে প্রশ্ন যেমন স্পেসিফিক করতে হয়, এই সংসদে সম্পূরক প্রশ্নও একই রকম করতে হবে। আমি যদি কথা বলতে না পারলাম, এটাই যদি ডেমোক্রেসি হয়।’

এ সময় স্পিকার তাকে বলেন, ‘আপনি উত্তর দেন, মাননীয় সদস্য।’ 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বলেন, ‘আমি কি শুনতাম? কেউ তো শুনছেন। আপনি উত্তর দেন। প্রশ্ন যে করেছে, তার উত্তর দেন।’

স্পিকার আবারও সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রথমে বলেছেন, আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধীদলের নেতাকে দেবো।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, আপনারা দুই মিনিট ধৈর্য ধরুন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্তর শুনুন।’ এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনি জবাব দেন।’

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনও এমপির মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়নি—এমন অভিযোগ করলে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে হবে। কোথায় ছিনতাই হয়েছে এবং সেই ঘটনায় আসামি গ্রেফতার হয়নি, তারও স্পেসিফিক বর্ণনা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু হাওয়াইভাবে যদি বলা হয়, এ সব হচ্ছে, প্রতিকার কী—বিরোধী এমপির ওপর হামলা হচ্ছে, প্রতিকার কী—স্পেসিফিক কোয়েশ্চেন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সেজন্য বলছি, এটা মহান জাতীয় সংসদ। বাইরের বক্তৃতা এখানে চলবে না।’ 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করলে স্পিকার তাকে ধন্যবাদ জানান। এরপর বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ফ্লোর দেওয়া হয়। বিরোধীদলীয় নেতা বক্তব্য শুরু করার পর সংসদে চলতে থাকা হই চই ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটে।