সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ বুধবার জাতীয় সংসদে তীব্র বাকবিতণ্ডায় রূপ নেয়।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদীয় রীতিনীতি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলে সরকারি দলের সমালোচনা করেন। তবে তার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তাহের বলেন, সরকারি দলের সদস্যদের আচরণে সংসদে থাকার বিষয়ে বিরোধী দলের আগ্রহ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিষয়টিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাতে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে তাদের ২৬ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকা উচিত। এ বিষয়ে একটি বৈঠকে সরকারি দল সম্মত হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে কৃষি, শিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক, সড়ক পরিবহন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং ধর্মবিষয়কসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ১০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়।
তবে বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, সংসদের ফ্লোরে কিংবা অন্যকোনো ফোরামে সরকার বিরোধী দলকে ১০টি সভাপতির পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—এমন কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কী অনুপাতে বণ্টন হবে, সে বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংসদীয় রীতি অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা এতে আরও জোরালো হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্বীকার করেন, সংবিধান বা কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের আসনসংখ্যার অনুপাতে দেওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
তিনি বলেন, সংবিধান বা কার্যপ্রণালি বিধির কোথাও বলা নেই যে, বিরোধী দলের সদস্যদের আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটির সভাপতির পদ দিতে হবে।
তবে সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার ভিত্তিতে তাদের ২৬ শতাংশ কমিটির সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল বলে স্বীকার করেন সালাহউদ্দিন।
তিনি বলেন, আমরা যদি তাদের এটা না দিই, তাহলে সেটা সমঝোতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। তবে এতে আইন বা কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘিত হবে না।
সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিনিময়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার কোনও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও করেন তাহের।
তিনি বলেন, আমরা তো বাচ্চা ছেলে না যে আমাদের ললিপপ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। এ ধরনের প্রস্তাবকে ‘দুর্ভাগ্যজনক ও অশোভন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এমন কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও প্রক্রিয়াগত বাধা নেই। তবে এসব পদকে বিরোধী দলের সাংবিধানিক বা আইনগত অধিকার হিসেবে দাবি করা যাবে না।
সংসদে বিতর্কের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বারবার হস্তক্ষেপেরও সমালোচনা করেন তাহের। এতে অন্য সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয় এবং সুস্থ সংসদীয় অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া স্বৈরাচারী আচরণে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তাহের।
তবে এ তুলনা প্রত্যাখ্যান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালের সংসদেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল।
তাহের সরকারি দলকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বৈষম্য সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান। দেশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সম্মান দেখানোরও আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমরা আরেকটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাই না। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহারেরও নিন্দা জানান তিনি।
বক্তব্য শেষ করে তাহেরসহ বিরোধী দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
পরে তাদের অনুপস্থিতিতে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যে মনে হয়েছে, তিনি সরকারের জবাব শুনতে চেয়েছিলেন। তবে জবাব শোনার আগেই তিনি অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করেন।
/এসএমএ/এম/