তিন বছর পর আবারও সেরা করদাতা সম্মাননা দিতে যাচ্ছে সরকার। তবে এবার শুধু সর্বোচ্চ আয়কর পরিশোধ করলেই এ স্বীকৃতি মিলবে না। কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা ব্যাংকঋণ খেলাপি থাকলে সেরা করদাতার তালিকা থেকে বাদ পড়তে হবে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ‘সেরা করদাতা সম্মাননা প্রদান নীতিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।
নতুন নীতিমালায় ব্যক্তি, পেশাজীবী, কোম্পানি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারীদের সম্মাননা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৭২ জন করদাতাকে এ সম্মাননা দেওয়া হবে। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে ৩৩ জন, সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী কোম্পানি ১৫টি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাত থেকে আরও ২৪টি কোম্পানি থাকবে।
সরকারের লক্ষ্য, সর্বোচ্চ কর প্রদানকারীদের স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে কর প্রদানে উৎসাহ তৈরি করা এবং অন্য নাগরিকদের নিয়মিত কর পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করা। প্রতি অর্থবছরে অব্যবহিত আগের করবর্ষে পরিশোধিত আয়করের পরিমাণের ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা নির্বাচন করা হবে।
ব্যক্তি ও পেশাজীবীদের জন্য সম্মাননা
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তি শ্রেণিতে বিশেষ ক্যাটাগরিতে ২৪ জনকে সম্মাননা দেওয়া হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১৫ জন ব্যক্তি থাকবেন। পাশাপাশি সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে একজন নারী ও একজন পুরুষ, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং পাঁচজন নারী করদাতাকে সম্মাননা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া পেশাজীবী শ্রেণিতে আরও ৯ জন সম্মাননা পাবেন। বেতনভোগী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, খেলোয়াড় এবং শিল্পী—প্রতিটি শ্রেণি থেকে একজন করে নির্বাচিত হবেন।
কোম্পানি পর্যায়ে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী ১৫টি কোম্পানিকে সম্মাননা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জীবনবিমা, সাধারণ বিমা, চিকিৎসাসেবা, তৈরি পোশাক, প্রকৌশল, ইস্পাত, কৃষি ও খাদ্য, জ্বালানি, পাট, স্পিনিং ও টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, গণমাধ্যম, আবাসন, চামড়া, শিক্ষা, পর্যটন, চা ও সিরামিকসহ বিভিন্ন খাত থেকে আরও ২৪টি কোম্পানিকে বাছাই করা হবে।
যেসব কারণে বাদ পড়বেন
নীতিমালায় সেরা করদাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কর পরিশোধে ব্যর্থতা, অতিরিক্ত বকেয়া কর থাকা কিংবা নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন ও প্রয়োজনীয় বিবরণী জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট করদাতা সম্মাননার জন্য অযোগ্য হবেন।
আন্তর্জাতিক লেনদেনকারী কোম্পানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরমে আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত বিবরণী জমা না দিলেও সম্মাননা পাওয়া যাবে না। আয়কর বা দানকর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কিংবা পুনঃনিরীক্ষার মামলা চলমান থাকলেও কোনো করদাতাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনও সরকারি সংস্থার তদন্তে কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, আন্তর্জাতিক অপরাধ, দুর্নীতি বা অনিয়মে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে ওই করদাতাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে।
একইভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণগ্রহীতারাও সেরা করদাতার তালিকায় স্থান পাবেন না। প্রয়োজনে সরকার কোনও করদাতাকে দেওয়া সম্মাননা পরবর্তী সময়ে প্রত্যাহারও করতে পারবে।
তিন বছর পর ফিরছে সম্মাননা
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের আগে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স কার্ড বা কর কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০২২-২৩ করবর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা হিসেবে ৭৬ ব্যক্তি, ৫৪ প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য শ্রেণিতে ১১ জন বা প্রতিষ্ঠানকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
এর পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ২০২২-২৩ করবর্ষে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ৫৪ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সম্মাননা ও সম্মাননাপত্র দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিট।
নতুন নীতিমালার আওতায় নির্বাচিত সেরা করদাতাদের নাম গেজেটে প্রকাশ করা হবে। তাদের দেওয়া হবে করদাতা সম্মাননা কার্ড ও ক্রেস্ট। গেজেটে নাম প্রকাশের পর দুই বছর পর্যন্ত সম্মাননা কার্ডের মেয়াদ ও নির্ধারিত সুবিধা বহাল থাকবে।