সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, খাঁটি মধুর নামে চিনির সিরাপ এবং ঘি-মাখনে নিম্নমানের চর্বি ব্যবহারের অভিযোগ তুলে খাদ্যপণ্যের নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিন। একইসঙ্গে পরীক্ষিত পণ্যের নাম, ব্র্যান্ড, ব্যাচ নম্বর ও পরীক্ষার ফলাফল জনগণের জন্য প্রকাশ এবং প্যাকেটজাত খাদ্যে কিউআর কোড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
সানসিলা জেবরিন বলেন, ‘আমরা বাজার থেকে খাবার কিনি কিন্তু নিরাপত্তা কিনতে পারি না। আমরা মোড়ক দেখি, দাম দেখি, মেয়াদ দেখি; কিন্তু খাবারের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বিষ দেখি না।’
খাদ্যে ভেজালের বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আটা, ময়দা, সুজি ও মসলা থেকে শুরু করে দুধ, দই, ঘি, মাখন, মধু, ভোজ্যতেল, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, নুডলস, চিপস, মিষ্টি, আইসক্রিম, জুস, শরবত, আচার, সস ও বোতলজাত পানিসহ বিভিন্ন খাদ্যে ভেজাল, দূষণ বা মানগত ত্রুটির অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কোথাও সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, কোথাও খাঁটি মধুর নামে চিনির সিরাপ, কোথাও ঘি-মাখনে নিম্নমানের চর্বি, আবার কোথাও মসলাকে আকর্ষণীয় করতে অনুপযুক্ত রং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।’
ফল দ্রুত পাকানোর নামে অননুমোদিত রাসায়নিকের অপব্যবহার, একই তেলে বারবার খাবার ভাজা এবং বাসি খাবারকে নতুন মসলা, রং ও সসের আড়ালে ‘তাজা’ হিসেবে পরিবেশনের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়েও উদ্বেগ
খাদ্যে ভেজালের পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সানসিলা জেবরিন। তিনি বলেন, পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বোতলজাত পানি থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষিত খাদ্য ও পানীয়তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে।
কাগজের কাপ হিসেবে ব্যবহৃত কিছু কাপে ভেতরে প্লাস্টিকের আবরণ থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাপের সংস্পর্শে সেখান থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পানীয়তে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে গবেষণা রয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে কতটা ক্ষতি করে, তা নিয়ে গবেষণা চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রদাহ, কোষীয় ক্ষতি, হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সম্ভাব্য ব্যাঘাত এবং প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিশুখাদ্যে ‘জিরো টলারেন্স’
শিশুখাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সানসিলা জেবরিন বলেন, বিদেশি নাম, চকচকে মোড়ক কিংবা দামি প্যাকেজিং দেখে অনেক সময় ভোক্তারা পণ্যটি নিরাপদ বলে ধরে নেন। কিন্তু বিদেশি নাম নিরাপত্তার সার্টিফিকেট নয়, চকচকে মোড়কও বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা নয়।
‘অনিবন্ধিত ও মানহীন শিশুখাদ্যের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স থাকতে হবে’—মন্তব্য করে তিনি বলেন, মানহীন শিশুখাদ্য একটি শিশুকে তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থ করার পাশাপাশি তার শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সারা বছর নজরদারির দাবি
রমজানে অভিযান, ঈদে মোবাইল কোর্ট কিংবা উৎসবকেন্দ্রিক নজরদারি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সানসিলা জেবরিন বলেন, ‘ভেজাল কোনও মৌসুমি অপরাধ নয়। তাই নিরাপদ খাদ্যের নজরদারিও মৌসুমি হতে পারে না।’
তিনি বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ, দই, শিশুখাদ্য, গুঁড়া মসলা ও বেকারি পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।
একই সঙ্গে পরীক্ষিত পণ্যের নাম, ব্র্যান্ড, ব্যাচ নম্বর ও পরীক্ষার ফলাফল জনগণের জন্য সহজে উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
খাদ্যপণ্যে কিউআর কোড চালুর প্রস্তাব
সানসিলা জেবরিন ‘ডিজিটাল ফুড ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম’ চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্যাকেটজাত খাদ্যে একটি যাচাইযোগ্য কিউআর কোড থাকবে। ক্রেতা মোবাইল ফোনে সেটি স্ক্যান করলেই জানতে পারবেন পণ্যটি কে তৈরি বা আমদানি করেছে, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ কী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাচের পরীক্ষার তথ্য কী।
কোনও ব্যাচে আগে ভেজাল, দূষণ বা মানগত ত্রুটি ধরা পড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেই তথ্যও পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
অনিবন্ধিত শিশুখাদ্য দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রির ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি।
ভেজাল প্রমাণিত হলে শুধু সামান্য জরিমানা দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয় মন্তব্য করে তিনি প্রয়োজনে পণ্য প্রত্যাহার, জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে খাদ্যে ভেজাল, খাদ্যদূষণ ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
সানসিলা জেবরিন বলেন, ‘মানুষের প্লেটে ক্ষতিকর খাবার পৌঁছে যাওয়ার পর শুধু জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ক্ষতিকর খাবার যেন মানুষের প্লেট পর্যন্ত পৌঁছাতেই না পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কোনও বিলাসিতা নয়। নিরাপদ খাদ্য কোনও অনুগ্রহও নয়। নিরাপদ খাদ্য মানুষের অধিকার।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘খাবারের রং নয়, নিরাপত্তা চাই। মোড়কের চাকচিক্য নয়, বিশুদ্ধতা চাই। অভিযান শুধু উৎসবে নয়, নজরদারি চাই সারা বছর।’