জাতিসংঘে আস্থা ফেরানোই অগ্রাধিকার: ড. খলিলুর রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতিসংঘে আস্থা পুনরুদ্ধার, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সংলাপ বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তোলার অঙ্গীকার করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে নিজের অগ্রাধিকার ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টা তার সভাপতিত্বে বসবে ৮১তম অধিবেশনের প্রথম বৈঠক।

সাংবাদিকদের ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ ও সামগ্রিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা তিনি দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতায় আগে দেখেননি। তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নতুন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে জাতিসংঘের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সুযোগ কাজে লাগাতে সহযোগিতা ও সংলাপকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।

তিনি বলেন, সব সমস্যার দ্রুত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। কিছু বিষয়ে সমাধান পেতে সময় লাগবে। তবে যেখানে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে, সেখানে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করার লক্ষ্য

নিজের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সনদ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেওয়া ম্যান্ডেটের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বস্ত থাকার কথা জানান ড. খলিলুর রহমান। তার মতে, সদস্যরাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে কাজ করলে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংকটগুলো সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়বে।

জাতিসংঘের সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিল্প ও ব্যবসায়িক নেতৃত্ব, উদ্ভাবন খাত এবং শিক্ষাবিদদের জাতিসংঘের কার্যক্রমে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ সনদের শুরুতেই বলা হয়েছে ‘উই দ্য পিপলস অব দ্য ইউনাইটেড নেশনস’—অর্থাৎ এটি শুধু সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সংগঠন নয়, জনগণেরও প্রতিষ্ঠান। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের কণ্ঠস্বরকে জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।

প্রার্থী হিসেবে তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা’। সভাপতি হিসেবে এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন জাতিসংঘকে ‘ভবিষ্যতের উপযোগী’ করে তোলার লক্ষ্য। এমন একটি জাতিসংঘ গড়ে তুলতে চান, যেখানে দেশগুলো আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহের সঙ্গে জাতিসংঘের পক্ষে ভোট দিতে পারে।

রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি

রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘের ‘পিপলস’ ধারণার মধ্যে সব মানুষই অন্তর্ভুক্ত।

রোহিঙ্গা সংকটে নিজের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি তাদের দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখেছেন। গত বছর রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন এবং জাতিসংঘের মহাসচিবকে রোহিঙ্গা শিবিরে নিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়া। তাদের কণ্ঠস্বর জাতিসংঘে তুলে ধরার কাজ তিনি অব্যাহত রাখবেন।

বিশ্বনেতাদের বক্তব্য থেকে অভিন্ন এজেন্ডা

আসন্ন সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভিন্ন অবস্থান তৈরির বিষয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বিশ্বনেতাদের একত্র হয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধান, উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার আহ্বান জানাবেন তিনি। বিশ্বনেতাদের বক্তব্য থেকে অভিন্ন বিষয়গুলো চিহ্নিত করে একটি ‘কমন এজেন্ডা’ তৈরির চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

নতুন মহাসচিব নির্বাচন প্রসঙ্গ

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব একজন নারী হওয়া উচিত কি না; এমন প্রশ্নেরও জবাব দেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, মহাসচিব নির্বাচন বা নিয়োগের ক্ষমতা তার হাতে নেই। এটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদ মহাসচিব পদের জন্য সুপারিশ করবে এবং সাধারণ পরিষদ তাকে নিয়োগ দেবে।

তাই এ প্রক্রিয়ায় তিনি সনদের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বস্ত থাকবেন বলে জানান। পাশাপাশি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এবং নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের অগ্রাধিকার সম্পর্কে ড. খলিলুর রহমান বলেন, সংলাপ, সহযোগিতা, আস্থা পুনর্গঠন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই ৮১তম অধিবেশনকে এগিয়ে নিতে চান তিনি।