সারের মজুত থাকলে কৃষকের হাহাকার কেন, সংসদে প্রশ্ন

দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃষককে সার না পাওয়ার অভিযোগের মুখে পড়তে হচ্ছে কেন—এ প্রশ্ন তুলে সরকারের সার ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কুড়িগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী। তিনি বলেছেন, সার সংকট আগামী রবি ও বোরো মৌসুম পর্যন্ত চললে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংসদে বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এর আগেও সার সংকট হয়েছে। ১৯৯৫ সালে সার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ১৩ থেকে ১৯ জন কৃষক নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও তিনি উলিপুরে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে সার না পাওয়ার অভিযোগ শুনেছেন।

তিনি বলেন, নাগেশ্বরীতে কৃষকেরা একটি গুদাম লুট করেছেন, রৌমারীতে অসন্তোষ হয়েছে। পুঠিয়ায় এক কৃষক বলেছেন, ‘হয় আমাকে সার দাও, না হলে বিষ দাও।’ লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায়ও অসন্তোষ রয়েছে।

সালেহী বলেন, ‘সার যদি মজুত থাকে, তাহলে কৃষকদের এই হাহাকার কেন? এখানে কি কোনও ফেইলর আছে? হ্যাঁ, অবশ্যই ফেইলর আছে। অবশ্যই এই ফেইলারটা হলো সরকারের।

তিনি বলেন, সার ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, সরবরাহ এবং কালোবাজারি বন্ধে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে। ডিলার সিন্ডিকেট ভেঙে কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার।

গ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ এখন অনেকটা ‘অতিথি’। একজন শিক্ষার্থী বিদ্যুতের খুঁটির দিকে তাকিয়ে বলেছে, তারটা যদি একটু নিচে থাকতো, তাহলে বিদ্যুৎ আরও দ্রুত আসতো।

সালেহী বলেন, সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশে সার আছে বলা হলেও কৃষক তা না পেলে সরকারের বক্তব্যে বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালের পর সংসদ সদস্যদের জেলা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরের একটি পরিপত্রেও এই ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টের নতুন পরিপত্রে ৩৪৯ সংসদ সদস্যকে ওই কমিটিতে রাখা হয়নি। কেন তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।

তার ভাষ্য, কোনও কৃষককে ১০-১৫ দিনের মধ্যে দেওয়ার কথা বলে ৩০-৪০ দিন পর সার দিলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। আবার কৃষককে যদি ৩০০, ৪০০ বা ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি দুটোই বাড়বে।

রাজশাহীকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে সেখানে টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৪৫ টন। অথচ সেখানে প্রায় চার লাখ কৃষক এবং প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর পুকুর ও মাছ চাষের এলাকা রয়েছে। কৃষির প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক সার চাহিদা নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।

সালেহী বলেন, চাহিদা নিরূপণ ব্যবস্থা গতিশীল নয়। আতঙ্ক ও গুজবের কারণে কৃষকেরা আগেই সার কিনে রাখছেন। পাশাপাশি মজুতদারি, কালোবাজারি, ডিলারদের অনিয়ম ও সময়মতো সার না তোলার কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে।

তিনি ইউনিয়নভিত্তিক ‘ডিজিটাল ফার্টিলাইজার ডিমান্ড ম্যাপ’, জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে মজুতের তথ্য দেখানোর মোবাইল অ্যাপ ও ড্যাশবোর্ড, কৃষকের ডিজিটাল কার্ড এবং সার পরিবহনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালুর প্রস্তাব দেন।

তিনি বলেন, দেশের সাতটি সার কারখানার পাঁচ-ছয়টি গ্যাস সংকটে বন্ধ। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে বন্ধ কারখানাগুলো আধুনিকায়ন, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং রাশিয়া, চীন ও মিসরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রস্তাব দেন তিনি।
 
মন্ত্রীর জবাব

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মির্জা শাহ আলম বলেন, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক সার ডিলার এখনও দায়িত্বে রয়েছেন। অনেকে পলাতক থাকায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং আবেদন করার শেষ সময় আগামীকাল। এতে প্রায় ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগ পাবেন। নতুন ডিলাররা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে আরও দুজন করে খুচরা বিক্রেতা নিয়োগ করতে পারবেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। ২৯ আগস্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ঘটনায় ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সার তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ভারতে ও মিয়ানমারে পাচারের প্রবণতা রয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ধরনের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেফতার করে সার জব্দ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারীর ঘটনা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনে কৃষকদের উসকানি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও সড়ক অবরোধ ও আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরে অন্য ডিলারের কাছ থেকে অতিরিক্ত সার এনে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের সার বিতরণ কমিটির উপদেষ্টা করার প্রস্তাবের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সার বিতরণের দায়িত্ব সংসদ সদস্যরা; আমার মনে হয় নিতে চান না। আমরা, ট্রেজারি বেঞ্চের যারা আছি, আমরা কেউই সার বিতরণের দায়িত্ব নিতে চাই না। ডিলাররা করবে।’

তিনি বলেন, ‘কৃষকেরা আগাম কিনছেন; এটিও প্রমাণ করে যে সার পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি জেলায় কৃষি বিভাগ ও সরকার অতিরিক্ত সার মজুতের ব্যবস্থা করেছে।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, কৃষক কার্ড দেওয়ার কাজ চলছে। ডিসেম্বর বা জানুয়ারির মধ্যে প্রায় দুই কোটি কৃষককে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।