উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণখেলাপির কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার দায়িত্ব বিএনপির কাঁধে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র পেয়েছে বর্তমান সরকার। তবে বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ঋণখেলাপির অনুপাত কমতে শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালে ঋণখেলাপির পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ১১ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রকৃত হার ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
তারেক রহমান বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে ঋণখেলাপির অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরে যেখানে ঋণখেলাপির অনুপাত ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে তা কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। ‘অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে’—বলেন তিনি।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল এবং সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের লুটতরাজ ও টাকা পাচারের কারণে এখনো দেশের জনগণের কাছে হাজারো কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ বাকি রয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি। যারা বাংলাদেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছেন, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশকে এখনো সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।’
এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকার দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিল দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে কলঙ্ক ছিল, বিএনপি সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘এটি আমার কথা নয়। যে প্রতিষ্ঠানটি এই র্যাংকিংগুলো করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের স্ট্যাটিসটিকস যদি আপনারা দেখেন, তাহলে এটি পরিষ্কারভাবে ভেসে উঠবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে জনরায়ে প্রত্যাখ্যাত শক্তি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে এবং জনগণের অধিকার ও ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগে তাদের দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট ও টাকা পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ভঙ্গুর পরিস্থিতি ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এসব সমস্যা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না। এই সমস্যাগুলোর ব্যাপারে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাই এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে চাই।
বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে
বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক শালীনতার বিষয়েও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে এবং বাকস্বাধীনতা রয়েছে। তবে বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা যেরকম চাই না দেশের জনগণের কাঁধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসন চেপে বসুক, যেকোনও বিবেকবান মানুষ, যেকোনও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ—অবশ্যই আমরা চাই না আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত হয়।”
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের জন্য দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা তাহলে গালাগালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা গ্রহণ করি।’
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা রক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে লাখো মানুষ জীবন দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময়ও মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধকে পবিত্র কর্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব শহীদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ভিন্নমত থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। তবে ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
গণতন্ত্রপন্থি শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিরোধের সুযোগে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট শক্তি যাতে পুনর্জীবিত হতে না পারে, সেদিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই, শহীদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসাবেই অবশ্যই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সংসদ পরিচালনায় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা ও চিফ হুইপসহ সব সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, গণপূর্ত, বিদ্যুৎ, টেলিফোন বিভাগ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সংসদে কর্মরত সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি টেলিভিশন ও গণমাধ্যমের সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।