জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের পর কেটে গেছে ১২ দিন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনও নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে নতুন মূল বেতন কোন পদ্ধতিতে নির্ধারিত হবে, ইনক্রিমেন্ট ও সার্ভিস বেনিফিট কীভাবে সমন্বয় হবে, কার বকেয়া কত দাঁড়াবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ আটকে আছে মূলত তিন পর্যায়ের কাজ শেষ না হওয়ায়। নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া বিধান আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একইসঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা ও সুবিধা নিয়ে কিছু বিষয় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। এর বাইরে নতুন স্কেল অনুযায়ী বেতন ও পেনশন হিসাবের জন্য সমন্বিত বাজেট ও হিসাবব্যবস্থা আইবিএএস++ এ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে। এসব কাজ শেষ হলে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ গেজেট প্রকাশের চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে কোনও নির্দিষ্ট তারিখ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। ঘোষিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন স্কেল গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা বলা হলেও পুরো বর্ধিত বেতন একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ নতুন হারের বিভিন্ন ভাতা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সরকারের হিসাবে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসবেন। পুরো বেতনকাঠামো কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
গেজেটই ঠিক করবে ‘কার বেতন কত’
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত কাঠামোতে গ্রেডভিত্তিক নতুন মূল বেতনের অঙ্ক জানা গেলেও চাকরিতে থাকা একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন নতুন স্কেলের কোন ধাপে স্থির হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। এ বিষয়টির উত্তর আসবে অর্থ বিভাগের বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনায়।
বিশেষ করে যাদের বর্তমান মূল বেতন সংশ্লিষ্ট গ্রেডে নতুন নির্ধারিত শুরুর বেতনের চেয়ে বেশি— তাদের বেতন কীভাবে পুনর্নির্ধারণ হবে, এ নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। ইনক্রিমেন্ট, চাকরির মেয়াদ ও বিদ্যমান আর্থিক সুবিধা নতুন স্কেলের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, সেটিও গেজেটে স্পষ্ট করতে হবে।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আগে ম্যানুয়্যালি হতো। ২০১৫ সালে অস্টম পে-স্কেল ঘোষণার পর প্রযুক্তিগত হিসাব ব্যবস্থা চালু করা হয়। এখন হয় প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেটা জেনেছি, প্রযুক্তিগত কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। অন্য কোনও জটিলতা আপাতত নাই।’’
একই সংগঠনের আরেক সাবেক সভাপতি বেলাল হোসেন এর আগে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, নতুন পে-স্কেল ঘোষণাকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তিন ধাপে বাস্তবায়ন এবং বর্তমান বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট কীভাবে নতুন স্কেলের সঙ্গে সমন্বয় হবে, তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত একজন কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা কতটা বাড়ছে, সেটি বলা কঠিন।
জুডিশিয়ারির দাবি নিয়েও পর্যালোচনা
গেজেট প্রকাশের আগে জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়েও প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, শতভাগ ভাতাসহ কয়েকটি সুবিধা নিয়ে দাবি ও প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এছাড়া, জাতীয় পে-স্কেলের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বেতনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া থাকায় দুই কাঠামোর মধ্যে কোনও অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও দেখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
বড় কাজ iBAS++ পুনর্বিন্যাস
পে-স্কেল বাস্তবায়নের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, কর্তন, আয়কর এবং পেনশনের বড় অংশের হিসাব পরিচালিত হয় আইবিএএস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে। নতুন স্কেল কার্যকরের আগে সেখানে নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স সংযোজন করতে হবে। প্রত্যেক কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী নতুন মূল বেতন নির্ধারণের পদ্ধতিও সফটওয়্যারে যুক্ত করতে হবে।
একইসঙ্গে ১ জুলাই থেকে নতুন স্কেল কার্যকর হলে জুলাই থেকে গেজেট কার্যকরের মধ্যবর্তী সময়ের বকেয়া বা অ্যারিয়ার কীভাবে হিসাব হবে, সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। লাখ লাখ কর্মচারীর জন্য একসঙ্গে এই হিসাব চালু করতে হলে তথ্য যাচাই ও সফটওয়্যার পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
পেনশনভোগীদের হিসাব
নতুন পে-স্কেল নিয়ে কর্মরতদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদেরও বড় আগ্রহ রয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অপেক্ষাকৃত কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। তবে পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধা কীভাবে সমন্বয় হবে এবং নতুন স্কেল কার্যকরের আগে ও পরে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের হিসাব কোন পদ্ধতিতে করা হবে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রয়োজন। এ কারণে পে-স্কেলের গেজেট শুধু নতুন বেতনের কয়েকটি অঙ্কের ঘোষণা নয়— এর সঙ্গে বেতন নির্ধারণ, পেনশন, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, অ্যারিয়ার এবং হিসাব পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ বিধান যুক্ত থাকবে।
অনিশ্চয়তা কাটবে গেজেটেই
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। আবার ঘোষণার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গেজেট না আসায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্নও। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গেজেট প্রকাশে বিলম্ব মানেই নতুন পে-স্কেল আটকে গেছে এমন নয়। আইনগত যাচাই, বিভিন্ন সুবিধার সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি শেষ করেই প্রজ্ঞাপন জারি করতে চায় সরকার।
এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর অর্থ বিভাগের সেই গেজেটের দিকে। কারণ মন্ত্রিসভার ঘোষণা নতুন বেতনকাঠামোর নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু কে ঠিক কত টাকা পাবেন, কোন তারিখ থেকে পাবেন এবং বকেয়া কীভাবে মিলবে, তার প্রকৃত উত্তর মিলবে গেজেটেই।