সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বাড়ছে। এতে একদিকে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় কম বেতন পাওয়া সরকারি ব্যাংকের কর্মীদের আয় বাড়বে। অন্যদিকে লোকসান, খেলাপি ঋণ, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকে বর্তমানে ৭১ হাজার ৫৭৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। ২০২৫ সালে এসব কর্মীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকগুলোর মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৮ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে আগামী কয়েক বছরে এ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ২০২৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বেতন-ভাতা ব্যয় ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ, কয়েক বছরের ব্যবধানে শুধু কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকগুলোর ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আয় ও মুনাফা না বাড়লে এ বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের লোকসান আরও বাড়াবে কিংবা সরকারি সহায়তার প্রয়োজন তৈরি করবে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বেশি চাপ লোকসানি ব্যাংকে
রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকি আটটির আর্থিক পরিস্থিতি নাজুক। বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে এসব ব্যাংক ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে জনতা, বেসিক, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের পাশাপাশি বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকও লোকসান ও আর্থিক ঘাটতির মধ্যে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটিতে বর্তমানে ১৪ হাজার ৩২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। ২০২৫ সালে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকটির ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৬৬ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে ব্যাংকটি। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৭৬ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। মূলধন ঘাটতিও ৬৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেতন-ভাতা ব্যয় বাড়লে ব্যাংকটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
বেসিক ব্যাংকের অবস্থাও একই রকম। ২০০৯ সালের পর থেকে নানা অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকটি ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে আসছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা নতুন কাঠামোয় বাড়লে আয় না বাড়িয়ে এ ব্যয় বহন করতে হবে ব্যাংকটিকেই।
খেলাপি ঋণের চাপেও বাড়বে ব্যয়
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার বড় কারণ খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ছিল খেলাপি। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে।
খেলাপি ঋণ থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমছে, আবার খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতেও বিপুল অর্থ আটকে থাকছে। এর সঙ্গে নতুন করে বেতন-ভাতা ব্যয় বাড়লে পরিচালন ব্যয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ব্যাংকটির প্রায় ১১ হাজার ৩০০ কর্মীর পেছনে ২০২৫ সালে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, সাধারণ নিয়মে ব্যাংক মুনাফা করলে কর্মীদের বেতন বাড়ে, ইনক্রিমেন্ট ও বোনাস হয়। কিন্তু বর্তমানে সোনালী ব্যাংক ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকই মুনাফায় নেই। তবে বেসরকারি অনেক ব্যাংকের তুলনায় সরকারি ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা কম হওয়ায় নতুন পে-স্কেলে সেই বৈষম্য কিছুটা কমবে।
তার মতে, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য কর্মদক্ষতার সূচক বা কেপিআই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ব্যাংক ভালো করলে কর্মীরা পুরস্কৃত হবেন, আর খারাপ করলে জবাবদিহির আওতায় আসবেন—এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত।
সোনালী ব্যাংক কিছুটা ব্যতিক্রম
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ ২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২১ হাজার ৫০০-এর বেশি।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির পরিচালন আয় হয়েছে ৫ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। তবে এ আয়ের ৮৩ শতাংশের বেশি এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ থেকে।
রূপালী ব্যাংকের অবস্থাও নাজুক। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটি ৬৪০ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান করেছে। ৭ হাজার ১৬৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ গত বছর ব্যয় হয়েছে ৭২২ কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি কার্যকর হলে এ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ওপর চাপ আরও বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরেও লোকসান ছিল ৬ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ৯ হাজার ৪৩০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।
সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মীদের বেতন সরকারি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকায় পে-স্কেল পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের বেতন বাড়াটাই স্বাভাবিক। তবে মুনাফাভিত্তিক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্সকে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বাড়তি ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বেতন-ভাতা বাড়লেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে?
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, শুধু বেতন-ভাতা বাড়িয়ে কর্মীদের সন্তুষ্ট রাখলেই হবে না; এর সঙ্গে ব্যাংকের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর শর্তও যুক্ত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি এবং ব্যাংকের আর্থিক উন্নতির জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বেতন বাড়বে, সঙ্গে বাড়াতে হবে দায়বদ্ধতাও
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ফলে কর্মীদের আর্থিক সুবিধা বাড়বে, এটি এক দিক। কিন্তু লোকসানি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এর আরেকটি দিক হলো বাড়তি পরিচালন ব্যয়।
ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ানো, খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়ম বন্ধ এবং ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বাড়তি বেতন-ভাতা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আর্থিক চাপই বাড়াবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকের জন্যও নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতার লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। এতে পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয় শুধু বোঝা না হয়ে ব্যাংকের সেবা ও দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।