জাতিসংঘে তারেক রহমানের অভিষেক, যে দুই কারণে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’

সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার ভোরে (২১ সেপ্টেম্বর) নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন তিনি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সেখানে তার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে অভিষেক ঘটছে তার।

সর্বশেষ ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন তার মা প্রয়াত খালেদা জিয়া। যদিও ১৯৯৩ সালে ৪৮তম অধিবেশন, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক সভা এবং ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক বিশেষ অধিবেশনেও অংশ নেন খালেদা জিয়া।

তারও আগে ১৯৮০ সালে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাষণ দেন তার স্বামী প্রয়াত জিয়াউর রহমান।

সাড়ে চার দশকের মধ্যে সরকারপ্রধান ও একই পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে একইমঞ্চে বক্তব্য রাখতে যাচ্ছেন তাদেরই উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিশ্বের যেকোনও দেশের ক্ষেত্রে এটি বিরল ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় চার দশক পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য হিসেবে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই দুই কারণে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এর মাধ্যমে দেশের গ্রহণযোগ্যতা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের অধিবেশনে আগামী দিনে ঢাকার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন পরবর্তী দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেবেন সরকারপ্রধান। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের প্রস্তাবনাগুলোও তুলে ধরবেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন এটি তো স্বাভাবিক বিষয়। অতীতের সরকারগুলোও তা দিয়েছেন। তবে তিনি তার বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার মতো সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো সেখানে যাচ্ছেন। বিশ্বে একই পরিবার থেকে নির্বাচিত তিন জন সরকারপ্রধান এমন সুযোগ পেয়েছেন কিনা আমার জানা নেই। তাছাড়া এবার একই সময়ে জাতিসংঘের সভাপতিত্ব করছে বাংলাদেশ। সেদিক থেকে এটি আমাদের জন্য ব্যতিক্রম। আশা করবো প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানের বিষয়টিও খোলাসা করবেন, এমনটি প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ।’’

তিনি বলেন, ‘‘ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই তার ভাষণে যেন জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন ঘটে।’’  

জিয়ার ভাষণের বিশেষত্ব

রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নথি অনুযায়ী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। তখন তেলের সংকট এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে নিজের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ নির্ধারণ ও তা অনুসরণের ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা জিয়াউর রহমান তার নিজস্ব ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তেলের সংকট, বিপুল বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় এবং কমে যাওয়া উন্নয়ন সহায়তার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আন্তর্জাতিক শান্তির সঙ্গে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্যের সম্পর্ক তুলে ধরেন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য, আর্থিক ও উন্নয়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিনি কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদনকে জাতীয় এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর কাছে আরও ভালো বাজার সুবিধা, বেশি উন্নয়ন সহায়তা এবং ঋণমুক্তির দাবি জানান। জিয়ার  ভাষণের  মূল কথা ছিল আত্মনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। এটি  বিচ্ছিন্ন  হয়ে যাওয়ার আহ্বান ছিল না। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, যা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে আরও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিজের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে পারে।

বাংলাদেশকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া

জাতিসংঘে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম ভাষণও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। যখন  দেশটি  সবেমাত্র সংসদীয় গণতন্ত্রে পা রেখেছে। ১৯৯৩  সালে তার ভাষণ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তাৎক্ষণিক ও জাতীয় কিছু বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় থেকে পুনরুদ্ধার, গ্রামীণ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীশিক্ষা  এবং  মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন।

এসব বিষয় ছিল মূলত অভ্যন্তরীণ। তিনি বাংলাদেশ নিজেদের সমস্যাগুলো  তুলে ধরছিলেন।

অপরদিকে ২০০৫ সালে খালেদা জিয়া আবারও ভিন্ন একটি অবস্থান থেকে বক্তব্য দেন। তার ভাষণে জাতিসংঘের সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার, উন্নয়ন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ এবং শান্তিরক্ষার বিষয়গুলো উঠে আসে। বাংলাদেশ তখনও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাছে বিভিন্ন দাবি জানাচ্ছিল। তবে একইসঙ্গে নিজেদের সেই ব্যবস্থার দায়িত্বশীল একটি দেশ হিসেবেও উপস্থাপন করছিল।

তিনি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান এবং শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। এ বার্তাটি  উন্নয়ন সহায়তার চেয়েও বিস্তৃত ছিল।

বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতিকে তুলে ধরবেন তারেক রহমান?

এরই মধ্যে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যে সময় বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবে।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে প্রাধান্য দেবেন তারেক রহমান। তাদের মতে, গণতন্ত্র, উন্নয়ন, সার্বভৌমত্ব  এবং  আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দায়িত্বকে কেন্দ্রে রেখেছিলেন জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া। তাদেরই সন্তান তারেক রহমান তার পররাষ্ট্রনীতির ভাষায় জাতীয় স্বার্থকে আরও স্পষ্টভাবে কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। তারা উল্লেখ করেন, শুধু তারেক রহমানই নন, ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবারও তিন প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েক পরিবারেও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রজন্মের পর প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কোনও নির্দিষ্ট পথনির্দেশ নিয়ে আসে না। প্রতিটি প্রজন্ম একটি ভিন্ন বিশ্বের মুখোমুখি হয়।

এর মাধ্যমে  জাতিসংঘে তারেক রহমানের উপস্থিতি একটি পারিবারিক মাইলফলকের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারে।বিশেষ করে ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যে বিশ্বে কাজ করেছিলেন, তিনি যে বিশ্বে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে তারেক রহমান যে বিশ্বে বক্তব্য দেবেন, তার প্রায় কোনোটিতেই মিল নেই। কারণ বাংলাদেশ এখন আর সেই তরুণ রাষ্ট্র নয়, যে অতিরিক্তভাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর অর্থনীতি, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকা বদলে গেছে। একইসঙ্গে বদলে গেছে এর সামনে থাকা প্রশ্নগুলোও—জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক জোট এবং রোহিঙ্গা সংকট পর্যন্ত।

এটাই যেকোনও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পরীক্ষা। জিয়াউর রহমান জাতিসংঘকে ব্যবহার করেছিলেন বৃহত্তর অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও শক্তিশালী কণ্ঠের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে। খালেদা জিয়া জাতিসংঘে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, উন্নয়ন-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন। এখন তারেক রহমানের সামনে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নিজস্ব অর্থ তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অতীতের ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন, এটা রুটিন ওয়ার্ক হিসেবেই দেখছি।’’

তিনি বলেন, ‘‘তবে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারে তার ভাষণের বিশেষ তাৎপর্য আছে বলে মনে করি। কারণ বৈশ্বিক দিক থেকে আমাদের নানা সংকট রয়েছে। আশা করবো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পক্ষে তিনি কণ্ঠস্বরের ভূমিকা রাখবেন। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে বিকল্প ঐক্যের কথা বলবেন।’’

একই পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের বিষয়টিকে আলাদা করে দেখতে চান না বলে জানান প্রিন্স। তাছাড়া জাতিসংঘের নিয়মিত অধিবেশনে একজন সরকারপ্রধানের সফর হিসেবেই তা মূল্যায়ন করতে চান বলে উল্লেখ করেন।

অতীতের চেয়ে এবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু সালেহ শিবলী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পর সরকারপ্রধান হিসেবে সেখানে যাচ্ছেন তারেক রহমান। আমরা মনে করি এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন মাইলফলক। বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তাছাড়া ৪০ বছর পর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এটিও বাংলাদেশের জন্য গৌরবের।’’ প্রেস সচিব  বলেন, ‘‘এর মাধ্যমে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে বাংলাদেশ।’’