একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এ কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেছেন, সফরের তৃতীয় দিনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের শুরুতেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। জবাবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ দিন পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারার অনুভূতির কথা প্রকাশ করেন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৭টায় (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টা) ‘জাতিসংঘের সদর দফতরে মিডিয়া চত্বরে’ প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ এবং তৃতীয় দিনের কার্যক্রম নিয়ে এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ মহাসচিবের অভিনন্দনের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক এ মঞ্চে এক সময় তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তাই এটি তার আবেগের জায়গা। বৈঠকে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বা ‘গ্র্যাজুয়েশন’ প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই উত্তরণের সময়সীমা যেন কিছুটা বাড়ানো হয়, সে বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আরও জানান, বহুপাক্ষিক কূটনীতি, বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অনন্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সংহতি ও যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার রয়েছে, তাকে ধারণ করেই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের এই ধারাবাহিকতায় আমরা আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে আরও এগিয়ে নিয়ে যাব।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভাষণকে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হয়েছে। এক আবেগঘন মুহূর্তে তিনি বিশ্বমঞ্চে দেশকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পূর্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এই ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রদানকে এক গৌরবময় ঘটনা বলে তিনি বর্ণনা করেন।
ভাষণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, এ ভাষণের মাধ্যমে একজন সরকারপ্রধান কীভাবে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন, তারই বহিঃপ্রকাশ বিশ্ববাসী দেখেছে। প্রধানমন্ত্রী কেবল বাংলাদেশের সীমানায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার রক্ষা এবং জাতিসংঘ কীভাবে সারাবিশ্বে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে, সেই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
মাহ্দী আমিন জানান, দেশের সার্বিক উন্নয়নে প্রতিটি শ্রেণি ও পেশার মানুষের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নীতি ও পরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হয়েছে। নারী, শিশু ও তরুণদের ক্ষমতায়ন ছাড়াও ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং পরিবেশের মতো জীবনের প্রতিটি মৌলিক খাতের পরিবর্তন ও অগ্রগতির পরিকল্পনা তিনি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, আগামীর একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার মূল পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। অডিয়েন্স অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এ বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। এই ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শুধু বাংলাদেশেরই প্রতিনিধিত্ব করেননি; বরং সারাবিশ্বের গণতন্ত্রকামী, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সফরসূচির তৃতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানমালাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে-দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক এবং উচ্চপর্যায়।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ককে বহুমাত্রিক পর্যায়ে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি ‘পিপল টু পিপল টাইজ’ বা জনগণের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এছাড়া সফরসূচিতে দুটি উচ্চপর্যায়ের কনফারেন্স ছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, যেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা অংশ নেন। এর একটি ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তথা পরিবেশবিষয়ক, এবং অন্যটি ছিল মিডওয়াইফারি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক। দ্বিতীয় সম্মেলনটি বাংলাদেশ সরকার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতায় আয়োজন করেছে।
জাতিসংঘে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক দুটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ও পরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব সম্মেলনে পরিবেশ রক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কাছে সমাদৃত হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, পরিবেশসংক্রান্ত সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিবেশ নীতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খনন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিস্তারিত উপস্থাপন করেছেন তিনি। এছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সম্মেলনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
অন্যদিকে, মিডওয়াইফারি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্মেলনে মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমানো নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া ও মায়েদের স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার যে ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিল, সরকার সেই ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ হাজারই হবেন নারী। এর পাশাপাশি শুধু মিডওয়াইফারি বা ধাত্রী সেবার জন্য ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে, যাতে একদম প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি পরিবারের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন আরও জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের যে পথচলা শুরু হয়েছিল এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যা নতুন মাত্রা পেয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে নারী ও মায়েদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত এই স্বাস্থ্যনীতি ও উদ্যোগগুলো উপস্থিত বিশ্বনেতা ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা পেয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্য ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা।