সরকার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

গণমাধ্যমকর্মীদের কোনও আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। সাংবাদিকরা যাতে অবাধে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই এই সরকারের লক্ষ্য। 

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। 

ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘আজ ডিআরইউর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে কার্যনির্বাহী কমিটির একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমাদের খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তারা কিছু দাবি-দাওয়া আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। সেগুলো কীভাবে পূরণ করা যায় এবং এ বিষয়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা চেয়েছি। আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করবো।’ 

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। সেই স্বাধীনতা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ 

তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘একই সঙ্গে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন, অর্থাৎ ভুল, অসত্য ও অপতথ্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে পরামর্শ করছে। সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের বিস্তার বন্ধ করা। তবে সেটা কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে আমরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলছি।’ 

প্রস্তাবিত আইনের আওতায় গণমাধ্যম বা সাংবাদিকরা পড়বেন কিনা এমন উদ্বেগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সরকার আমলে নিয়েছে। আইন প্রণয়নের সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। 

তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না। প্রধানমন্ত্রীও নিয়ন্ত্রণ করতে চান না, তার সরকারও করবে না, এ কথা আমরা বহুবার বলেছি।’ 

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি নেওয়ার প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তুলে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘একটি প্রস্তাব এসেছে, নিবন্ধিত ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট বা অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের যদি আইনের আওতায় আনতে হয়, তাহলে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আনা হবে। আমরা এই প্রস্তাবটি বিবেচনা করছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এ ধরনের একটি অপশন থাকা উচিত, যাতে গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অবাধভাবে কাজ করতে পারেন।’ 

তবে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মূলধারার গণমাধ্যমে কাজ করেন না, এমন কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে অপপ্রচার, ভুয়া ও অসত্য তথ্য ছড়িয়ে থাকেন। এ বিষয়েও সরকারকে কঠোরভাবে নজর দিতে হবে।’ 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ভুয়া তথ্যের কারণে মানুষের সম্মানহানি হচ্ছে, আবার কেউ কেউ মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। কোনও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও এআইয়ের অপব্যবহার করে মানুষকে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’ 

‘সাংবাদিক কে, তার সংজ্ঞা প্রয়োজন’

অনিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়েবসাইটভিত্তিক নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ খুলে সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচালনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিষয়টি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকেও আলোচনা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে ডিআরইউসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে।’ 

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রকৃত সাংবাদিক চিহ্নিত করার জন্য একটি মাপকাঠি প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যিনি সাংবাদিক নন কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, আজ একটি পেজ খুলছেন, কাল সেটি বন্ধ করে আবার অন্য নামে পেজ খুলছেন— তারপরও সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এখানে একটি মাপকাঠি থাকা উচিত।’

এ বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছেই প্রস্তাব চেয়েছেন উল্লেখ করে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘কাদের আপনারা সাংবাদিক বলতে চান, সেই সংজ্ঞাটি আপনারাই তৈরি করে দিন। আমরা সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গেও পরামর্শ করবো। “হু ইজ আ জার্নালিস্ট”। এই সংজ্ঞাটি আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।’

টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামোর পক্ষে প্রতিমন্ত্রী 

টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো, নিয়মিত বেতন ও ইনক্রিমেন্ট এবং ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, টেলিভিশন সাংবাদিকদেরও একটি কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে যারা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন, তাদের একটি কাঠামোর মধ্যে আনা উচিত। একটি ন্যূনতম বেতন বা বেজ থাকা উচিত। এতে টেলিভিশনের মানও উন্নত হবে, সাংবাদিকরা প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন এবং পেশাগত মান বাড়বে।’

এ বিষয়ে সরকার কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।’ 

ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের সঙ্গে শ্রম মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় জড়িত উল্লেখ করে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনা অব্যাহত আছে। যত দ্রুত সম্ভব এটি করার দিকে আমরা নজর দিচ্ছি। সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয় যেহেতু এর বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবেও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবো।’