যুক্তরাষ্ট্র সফরে কী পেলো বাংলাদেশ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল চার দিনের। স্বল্প সময়ের এই সফরে জাতিসংঘে বাংলায় প্রথম ভাষণ দেওয়া, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক, ১১টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতা; বিভিন্ন কারণে সফরটি আলোচনায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় দেওয়া তার প্রথম ভাষণকে সফরের অন্যতম প্রধান ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।

বাংলায় ভাষণ ও ‘৩-আর’ কৌশল

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের কথা তুলে ধরেন। রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তার সরকারের ‘৩-আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন কৌশলের কথাও জানান তিনি।

ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ও পরিবেশ, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক শান্তি, তরুণদের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ ফান্ড, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।

চার দিনে ৩০ কর্মসূচি

চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এর মধ্যে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ, সাতটি উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য, ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতিসংঘসহ ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ক্রোয়েশিয়া ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান।

এ ছাড়া বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্কের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

মাহদী আমিন জানান, এসব বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রফতানি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন সরকারের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথমবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আরও ১১টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি

জাতিসংঘ সফরের সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

চুক্তি অনুযায়ী, পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ কেনা হবে। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছিল বিমান। নতুন চুক্তির ফলে বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৫টিতে।

এপ্রিলের চুক্তিতে ৭৮৭-১০ মডেলের উড়োজাহাজ ছিল আটটি, ৭৮৭-৯ মডেলের দুটি এবং ৭৩৭-৮ মডেলের চারটি। ওই চুক্তির মূল্য ছিল ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণ, নতুন রুট চালু এবং বিমানের বহর আধুনিকায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই চুক্তি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিতে কোনও গোপন এজেন্ডা নেই; প্রয়োজন থেকেই বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতায় সমঝোতা

সফরের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা সই করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আন্ডার সেক্রেটারি ফর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স জ্যাকব হেলবার্গ এতে সই করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তি আইনের ১২৩ ধারার আওতায় এ ধরনের চুক্তিকে সাধারণভাবে ‘১২৩ এগ্রিমেন্ট’ বলা হয়। সমঝোতার আওতায় শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে এ বিষয়ে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ১৯৯১ সালের পর তা আর নবায়ন হয়নি।

রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ সমঝোতা হলো।

কোন কোন বিষয়ে আলোচনা

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ট্যারিফ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতের সঙ্গে জনশক্তি রফতানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং খনিজ খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

সফর থেকে কতটা অর্জন?

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মূলত একটি বহুপক্ষীয় ফোরাম। এখানে প্রতিটি সফরের সঙ্গে সরাসরি সুনির্দিষ্ট চুক্তি বা তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির বিষয়টি জড়িত থাকে না। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরিও এ ধরনের সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাবেক এক কূটনীতিক বলেন, সরকার গঠনের পর এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর। জাতিসংঘে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকার ও ইস্যু তুলে ধরার পাশাপাশি অধিবেশনের বাইরে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

তার ভাষায়, নতুন সরকার হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একটি দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে সেই যোগাযোগের একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে যোগাযোগের ক্ষেত্র আরও সহজ করতে পারে।