রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 

৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রথম দফার প্রজ্ঞাপনে নাম না আসা নিয়ে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে অপেক্ষমাণ ৪৬ জনের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন আগামী সোমবার (৫ অক্টোবর) জারি করার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির পোস্টের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টির ‘অপপ্রয়াস’ও লক্ষ্য করা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

৪৯তম বিশেষ বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল পিএসসি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পিএসসির সুপারিশ ছিল ৬৬৮ জনের। তাদের মধ্যে তিন জন প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত সনদ জমা দিতে পারেননি এবং আট জন নির্ধারিত মেডিক্যাল পরীক্ষায় উপস্থিত হননি। ফলে পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য থাকেন ৬৫৭ জন। তাদের মধ্যে প্রথম দফায় ৬১১ জনের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন হয়েছে। সেই হিসাবে আরও ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন একবারই হতে হবে এমন নয়, কয়েকবারও হতে পারে। চাকরিতে যোগদানের তারিখ ১২ অক্টোবর। আজ ১ অক্টোবর। এর মধ্যে এখনও সময় রয়েছে।’

প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনেও ৬১১ জনকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।

বাকি ৪৬ জনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী সোমবার তাদের প্রজ্ঞাপন জারির দিন নির্ধারিত আছে। তার আগে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রজ্ঞাপনের ফাইল রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত যায়।’

এ বিষয়ে জনপ্রশাসনমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রক্রিয়া শেষ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন। প্রয়োজনে শনিবার ছুটির দিনেও তারা কাজ করবেন।

‘রাজনৈতিক পরিচয়ে বৈষম্য হবে না’

নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অভিযোগের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনও প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে বৈষম্য করবে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছি। রাজনৈতিক পরিচয় যেটাই হোক, এই পরীক্ষা বা অন্য কোনও ক্ষেত্রে সেই কারণে কোনও বৈষম্য সৃষ্টি করা হবে না।’

একজন প্রার্থীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, প্রজ্ঞাপনে নাম না আসায় ওই ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে চাকরি পাবেন না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করার কারণ হবে না বলে আবারও আশ্বস্ত করেন তিনি।

তবে নিয়োগের আগে নিয়ম অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ বা আদালতের দণ্ডের মতো বিষয় থাকলে তা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিবেচনায় আসতে পারে।

তিনি বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন সরকারি চাকরিতে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। ভেরিফিকেশন নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা বা তদন্তের সুযোগ রয়েছে। ‘এখনও সেই সময় আসেনি’ মন্তব্য করে তিনি অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

‘অপতথ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করবেন না’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গেও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করা উচিত নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করার জন্য অপপ্রচার বা অপতথ্য দিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টি করার কোনও কারণ নেই। সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করবো, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য আমাদের ছাত্রছাত্রী ভাই-বোনদের যেন উত্তেজিত করা না হয়। তিনি আবারও বলেন, ‘আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না।’

সামাজিকমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো নিয়ে যা বললেন

অসমর্থিত তথ্য ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবারসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, অসমর্থিত তথ্যের ভিত্তিতে এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কাছ থেকে তথ্য যাচাই না করে এমন কিছু প্রচার করা উচিত নয়, যার ফলে সমাজে বড় ধরনের ক্ষতি, অস্থিরতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা থাকে। তবে বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনাকে নতুন প্রস্তাবিত বিধানের আওতায় নেওয়ার সুযোগ নেই।

হকার উচ্ছেদ ‘অস্থিরতার অংশ নয়’

মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির কোনও সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, ‘ফুটপাত হকারমুক্ত করা জনগণের দাবি, নাগরিকদের দাবি। আমরা হকারদের বেকার করতে চাই না। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা বিকল্প জায়গা বের করার চেষ্টা করছি।’

হলিডে মার্কেটসহ বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়।

মন্ত্রী বলেন, ‘নাগরিকদেরও অধিকার আছে। শুধু হকারদের কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, নাগরিকদের যাতায়াতের স্বাধীনতা ও সড়কের শৃঙ্খলাও রক্ষা করতে হবে।’

সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এসব অভিযান হয় এবং প্রয়োজনে পুলিশ সহায়তা দেয় বলে জানান তিনি।

মহিলা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এক মহিলা সংসদ সদস্যের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে কিনা বা এ বিষয়ে পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী হবে, তা স্পিকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দলীয় প্রধানও নই, স্পিকারও নই। দলীয় বিষয় দলের প্রধান বলতে পারবেন।’

তবে ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করা সমীচীন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দেশে সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার অপরাধকে রাজনৈতিক ‘মেসেজ’ হিসেবে নয়, অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, ‘যেখানেই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করছে, মামলা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে।’

অপরাধ প্রতিরোধে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ত্রুটি থাকলে সংবাদমাধ্যম তা তুলে ধরলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে অনেক ঘটনাই সরকারের নজরে আসে এবং তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।