প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান সমাজকল্যাণমন্ত্রীর

দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে বোঝা হিসেবে না দেখে মর্যাদাপূর্ণ পারিবারিক ও সামাজিক সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। একই সঙ্গে অস্বচ্ছল মানুষের জন্য চালু থাকা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও আওতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। 

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সমাজসেবা অধিদফতর আয়োজিত ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশের অস্বচ্ছল জনগোষ্ঠীর জন্য যে ভাতা প্রচলিত আছে, তা যথেষ্ট নয়। এই ভাতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে সব বয়স্ক মানুষ এর সুফল পান।’

দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ, অর্থাৎ এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ ষাটোর্ধ্ব। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি বা প্রায় পাঁচ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।’ 

গত ২৫ বছরে মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে গড় আয়ু ৭৪ দশমিক ৯ বছর। আগামী দিনে তা ৮০ বছর বা তার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ফলে দীর্ঘায়ুকে কেবল বয়স বৃদ্ধির হিসেবে দেখলে হবে না।’ 

তিনি বলেন, ‘এত বড় সংখ্যার দীর্ঘায়ু জনগোষ্ঠীকে শুধু সংখ্যা বা বয়স বৃদ্ধির পর্যায় হিসেবে না দেখে তাদের স্বাস্থ্যবান, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।’

প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হলেও এ বছর ওই দিন ফেনীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি থাকায় ঢাকায় মূল আয়োজনটি ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণ ও দীর্ঘায়ু নাগরিকদের জন্য কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’ ষাটোর্ধ্ব ও অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবাসহ সার্বিক কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তবে সরকারের একার পক্ষে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সব চাহিদা পূরণ সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি সামাজিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এর আগে সকালে আগারগাঁওয়ে প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সামনে থেকে নবীন-প্রবীণের অংশগ্রহণে একটি র‍্যালি বের হয়। র‍্যালিটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সমাজসেবা অধিদফতরের মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। 

আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ। বিশেষ আলোচক ছিলেন প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সামছুল ইসলাম, মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইনতেজার রহমান, সহসভাপতি মঞ্জু আরা বেগম, কেন্দ্রীয় সদস্য হায়াতুন্নবী এবং প্রবীণ নারী শিক্ষক মোমেনা খাতুন।

সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব।

আলোচনায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্য, উন্নয়নকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণ নাগরিকেরা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাধীন, স্বনির্ভর, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।

তারা প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ, অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি ভবন, মেট্রোরেল, ট্রেন, গণপরিবহন ও বিমানবন্দরকে আরও প্রবীণবান্ধব করার দাবি জানান। একই সঙ্গে প্রবীণদের আয় ও সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মক্ষমতাহীনদের সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং সম্পত্তি হস্তান্তরসহ প্রবীণদের কল্যাণে বিদ্যমান আইন, বিধি ও কর্মকৌশলের কার্যকর প্রয়োগের আহ্বান জানান। 

২০৫০ সালের বাংলাদেশ প্রবীণদের জন্য কতটা প্রস্তুত— এই প্রশ্ন সামনে রেখে বক্তারা বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে তাদের জন্য পৃথক ‘প্রবীণ অধিদফতর’ গঠন এখন সময়ের দাবি। 

বিশেষ করে প্রবীণ নারীদের জীবন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও বৈষম্যপূর্ণ বলে আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা বলেন, সম্পদের মালিকানায় নারীদের অংশ অত্যন্ত কম হওয়ায় বার্ধক্যে তাদের আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়। 

এ অবস্থায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রবীণদের জন্য নতুন শিখন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও খাদ্য সহায়তার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান প্রবীণ কল্যাণ কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানান তারা।