গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত

কারা ও মাদক অধিদফতরের দুই কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

দুর্নীতি, অসদাচরণ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কারা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দুই কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের সাবেক জেলার মো. আব্দুল ফাত্তাহ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা।

রবিবার (১১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন দুটিতে সই করেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মো. আব্দুল ফাত্তাহ কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের সাময়িক বরখাস্ত জেলার। এর আগে পঞ্চগড় জেলা কারাগারে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ওই কারাগারের ২০১৮ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের বিভাগীয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সরকারি অর্থ তছরুপ ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনটি ভুয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, বাবা মায়ের দোয়া, নুর স্টোর ও শুভ সি মিলের মাধ্যমে ৫৭টি ভুয়া বিল পাস করে মোট ১ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ কাজে জেলা সুপার, জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারী ও কারারক্ষী মো. জাফর মাহমুদ শাকিলের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসাজশের অভিযোগও উঠে আসে।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে ৪০ লাখ টাকা ৯টি চালানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের পঞ্চগড় শাখায় জমা দেওয়া হয়।

এ ছাড়া পঞ্চগড় জেলা কারাগারে বন্দির সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আব্দুল ফাত্তাহর বিরুদ্ধে। তিনি চারটি পৃথক চাহিদাপত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে তা আত্মসাতের চেষ্টা করেন। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে জেল সুপারকে বাইপাস করে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিল প্রস্তুত ও হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগও উঠে আসে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তিনি অভিযোগের লিখিত জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেন। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শের পর শেষ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতের সমন ও সাক্ষ্য প্রদানের সনদ জাল করে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলন করেছেন। আদালতে সাক্ষ্য না দিয়েও ভুয়া বিল দাখিল করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়াই ভ্রমণবিবরণী ও বিল অতিরিক্ত মহাপরিচালক, নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা এবং প্রত্যয়নপত্রের স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের স্বাক্ষর ব্যবহার করেছেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুলাল কৃষ্ণ সাহা ২০০০ সালের ২৮ জুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে রাসায়নিক পরীক্ষক পদে যোগ দেন। ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একই গ্রেডে কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে বিমানযোগে ভ্রমণের প্রাধিকারভুক্ত না হয়েও ২৩ বছরে শতাধিকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিমান ভ্রমণের বিল দাখিল করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করে সরকারের আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা করা হয়। অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী পাঠিয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়। পরে তিনি লিখিত জবাব এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেন।

বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রথমে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ পর্যালোচনার পর ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।

প্রজ্ঞাপনে দুলাল কৃষ্ণ সাহার বর্তমান কর্মস্থল হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বিভাগীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগার, সিলেটের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি সংযুক্ত থাকার পাশাপাশি রাসায়নিক পরীক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দুই কর্মকর্তাকেই গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।