দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না যাওয়ার সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যোগ নেই: তথ্য উপদেষ্টা

ভারতের নয়াদিল্লিতে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ অংশ না নেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। 

সাংবাদিকরা জানতে চান, বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই বৈঠকে যাননি এমন কিছু কিনা। তার পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে পাঠানোর পেছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে কিনা, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। 

জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন বৈঠকে যাননি, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই ভালো দিতে পারবেন। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো অংশগ্রহণ করছি। আমাদের সচিব যেহেতু গিয়েছেন, তার মানে বাংলাদেশ সেখানে অংশগ্রহণ করছে।’ 

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ডা. জাহেদ উর রহমান। এ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন ও ভারত থেকে প্রত্যর্পণ, ড. ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ, দিল্লিতে বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং পুলিশের মনোবল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

মন্ত্রী পর্যায়ের কোনও প্রতিনিধির জরুরি ব্যস্ততা থাকতেই পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটির সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে যুক্ত করে দেখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বৈঠকে কোনও প্রতিনিধি না পাঠালে অংশগ্রহণ না করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারতো। কিন্তু বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে।

প্রসঙ্গত, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের এই প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। সাত সদস্যের জোটটিতে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড রয়েছে।

পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন 

সম্প্রতি খুলনায় পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান সাংবাদিকরা। যে পুলিশ বাহিনীর কাছে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা চাইবে, সেই বাহিনীর সদস্যদেরই যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য রাতে একা বের না হতে বলা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার জন্য কার কাছে যাবে? 

জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হলে দেশের অতীত ও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনও পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছায়নি।

উপদেষ্টা বলেন, রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি পুলিশ বাহিনীর যে সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস থাকা দরকার, বর্তমান পুলিশ বাহিনী এখনও সেই সর্বোচ্চ অবস্থানে ফিরে যেতে পারেনি। এর পেছনে শেখ হাসিনার শাসনামলে পুলিশ বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, সেই বাস্তবতায় পুলিশের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে সংকট তৈরি হওয়ার কারণও রয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর পুলিশের আত্মবিশ্বাস ফিরছে 

পুলিশ বাহিনীর মনোবল প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পুলিশের আত্মবিশ্বাসের সংকট ছিল। নির্বাচনের পরও সেই সংকট পুরোপুরি দূর হয়ে যায়নি। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের পরপরই পুলিশের কর্মকাণ্ডে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। এর অর্থ পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে। তবে কোনও সংকট অবশিষ্ট নেই, সরকার এমন দাবি করছে না বলেও জানান তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘এখনও যে একদম কোনও সংকট নেই, আমরা সেটা বলতে চাই না। কিছু সংকট তো রয়েই গেছে। এটার জন্য সময় লাগবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার, যার পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে। এই সরকারের বৈধ ও আইনানুগ নির্দেশনা প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে তার হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকট অস্বীকার না করে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর করার দিকেই সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। 

প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়াতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ

গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা এবং সংবাদ উপস্থাপনসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি জটিল এবং এর বিভিন্ন দিক রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের বিদ্যমান সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে কাজ চলছে।

উপদেষ্টা বলেন, প্রেস কাউন্সিলের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন দায়িত্বশীলতাসংক্রান্ত অভিযোগ আদালতের প্রচলিত বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। এ বিষয়ে সরকার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে এবং প্রেস কাউন্সিলকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।