রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষ বা ভোক্তারা পকেটের টাকা খরচ করে যে পণ্য ব্যবহার করবেন, সেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং তা থেকে ন্যূনতম সন্তুষ্টি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যেকোনও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে বিশ্ব মান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘শেয়ার্ড ভিশন ফর আ বেটার ওয়ার্ল্ড— অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ক্লিন এনার্জি’ বা ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ দেশে পালিত হচ্ছে ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘মান অর্থাৎ স্ট্যান্ডার্ড। আমরা যদি আমাদের প্রতিটি ব্যবহার ও আচরণকে একটি মানে উন্নীত করতে পারি, তাহলে এই দিনটি শুধু স্ট্যান্ডার্ড বা মানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; একসময় তা মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠবে।’
তিনি বলেন, ‘মান প্রয়োজন এ কারণে যে, আপনি যদি জীবনযাত্রার গুণগত মান নিশ্চিত করতে চান, তাহলে আপনার ব্যবহৃত পণ্যগুলোর একটি ন্যূনতম গুণগত মান থাকতে হবে। আজ আমরা যে ভবনে বসে আছি, যদিও এই ভবনের ভাড়া অত্যধিক বেশি, তারপরও এখানে সিমেন্ট, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কাঠের সামগ্রী ও লাইটসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ভবনটি তৈরি করা হয়েছে। এখন যদি আমাদের সব সময় এই আতঙ্কে থাকতে হয় যে ভবনটি হঠাৎ ভেঙে পড়বে, তাহলে কেউ কি নিশ্চিন্তে বসতে পারবেন? সবাই সারাক্ষণ অস্থির থাকবেন এবং ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। একইভাবে, আমরা যে খাদ্যপণ্য খাই, সেগুলোর গুণগত মান সম্পর্কে যদি নিশ্চিত হতে না পারি, তাহলে মানুষ সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকবে। এসব পণ্য থেকে রোগবালাইয়ের সূত্রপাত হতে পারে। জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পণ্যের মান আপনাকে জীবনযাত্রার একটি ন্যূনতম মান নিশ্চিত করে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষ বা ভোক্তারা পকেটের টাকা খরচ করে যে পণ্য ব্যবহার করবেন, সেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং তা থেকে ন্যূনতম সন্তুষ্টি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যেকোনও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিএসটিআই হলো মান নির্ধারণ ও তা নিশ্চিত করার মূল সংস্থা। আমরা আগামী দিনে এই সংস্থার কার্যপরিধি আরও বাড়াতে চাই। বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালকের কাছ থেকে আমরা তার কিছু পরিকল্পনার কথা শুনেছি। ঠিক সেই পথে হাঁটবো কিনা, তা এখনই বলতে পারছি না। তবে আগামী দিনে বিএসটিআইয়ের জনবল বৃদ্ধি করে এর কার্যক্রম যেন সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত করা যায়, ইনশাল্লাহ, তা আমরা নিশ্চিত করবো।’
তিনি বলেন, ‘বিএসটিআইয়ের বর্তমানে তিনটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রথমত, বিএসটিআই কমপ্লেক্সের মধ্যেই ১৩ তলাবিশিষ্ট একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। সেখানে প্রায় ৬৩টি নতুন পরীক্ষাগার স্থাপন করা হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন করে ১০টি জেলায় বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটিও প্রায় একই আর্থিক ব্যাপ্তির আরেকটি প্রকল্প। তৃতীয়ত, প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মেট্রোলজি ল্যাবরেটরি স্থাপনের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এভাবে আমরা বিএসটিআইকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই, যাতে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও বৈশ্বিক পরিসরে সংস্থাটির অবস্থান ও স্বীকৃতি থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএসটিআই আগামী দিনে তার কার্যক্রম আরও জোরদার করবে, যাতে আজ আমরা হালাল সার্টিফিকেশনের জন্য যে অ্যাক্রেডিটেশন পেয়েছি, তার ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এ ধরনের সংস্থার সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি বা মিউচুয়াল রিকগনিশন অর্জন করা যায়। মূল কথা হলো, একজন মানুষ যখন জানবেন যে তিনি পেট্রোল পাম্প থেকে যে তেল নিচ্ছেন, তা পরিমাণে সঠিক; তিনি যে গ্যাস বা এলপিজি নিচ্ছেন, সেটিও পরিমাণে যথাযথ; তিনি যে দুধ পান করছেন, তার বিশুদ্ধতা নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করছে— তখনই তার মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। এ ধরনের নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ তৈরির জন্য বিএসটিআইয়ের কার্যপরিধি আমরা ক্রমাগত সম্প্রসারণ করতে থাকবো। মানুষের মধ্যে সন্তুষ্টি, নিরাপত্তাবোধ ও নিশ্চয়তা তৈরি করা যেকোনও দায়িত্বশীল সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। আর এটিই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
এসময় মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে একটি সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে সয়াবিন তেলে ভারী ধাতু, বিশেষ করে লেড বা সিসা রয়েছে। ওই খবর প্রকাশের পর আমরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের ওপর প্রায় ১৯৩টি পরীক্ষা করেছি। আমাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে থাকা সয়াবিন তেল সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ। এতে কোনও ভারী ধাতু বা লেড নেই। এটি সম্পূর্ণ অপপ্রচার।’
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, ‘একটি উন্নত বিশ্ব গড়ে তোলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। শিল্পোদ্যোক্তাদের পক্ষেও এককভাবে তা সম্ভব নয়। এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও ভোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি মানকে সব সময় একটি সনদ, পরীক্ষার প্রতিবেদন কিংবা পণ্যের গায়ে লাগানো একটি চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে মানের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারব না। মান হলো উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে আস্থার একটি অদৃশ্য চুক্তি। তাই একজন ভোক্তার আস্থা অর্জনের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক মান প্রণয়ন, সঠিকভাবে নমুনা সংগ্রহ, নির্ভুল পরীক্ষা এবং নিরপেক্ষ সনদ প্রদান অপরিহার্য।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক) অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল বলেন, ‘বিএসটিআই বিভিন্ন পণ্যের মান পরীক্ষা করছে। কিন্তু পণ্যের মান ঠিক না থাকলে কী হতে পারে? আগের প্রজন্মের অনেকেই ৮০ থেকে ৯০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন। কিন্তু এখনকার প্রজন্মের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেকে ৪০, ৫০ কিংবা ৬০ বছর বয়সেই মারা যাচ্ছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো অসংক্রামক রোগ। আমাদের দেশে মৃত্যুর ৬৭ শতাংশের কারণ অসংক্রামক রোগ।’
তিনি বলেন, ‘এই রোগগুলো কেন বাড়ছে? খাদ্যে ভেজাল এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের অপব্যবহার এর অন্যতম কারণ। আমরা যেসব রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করছি, সেগুলোতেও ভেজাল দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ক্যানসার, হৃদ্রোগ, লিভারের রোগ, কিডনির রোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রকোপ সমাজে বেড়ে যাচ্ছে। তাই এ ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত আমাদের সবারও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের মধ্যে যদি এই দায়িত্ববোধ তৈরি না হয়, তাহলে আমরা কখনোই জাতিগতভাবে উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারবো না।’
বিএসটিআই মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো ‘উন্নত বিশ্ব গড়তে সবার অভিন্ন লক্ষ্য এবং সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করা’। জ্বালানি কেবল প্রযুক্তি বা সুযোগের বিষয় নয়। এটি আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বর্তমানে শুধু জ্বালানি উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়; সেই জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, ‘মান কেবল বিলাসিতা নয়। মানসম্মত পণ্য, নিরাপদ খাদ্য, সঠিক ওজন ও পরিমাপ এবং ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে স্ট্যান্ডার্ডের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। মানুষের এই প্রত্যাশাকে আস্থায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।’
বিএসটিআইয়ের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশের জনগণের স্বার্থ সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘বিএসটিআইয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব করছি। এই ইউনিটের মূল দায়িত্ব হবে বাজারে নকল, ভেজাল, মানহীন ও অননুমোদিত পণ্যের উৎস শনাক্ত করা। ঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা, পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক তদারকি কার্যক্রমে সহায়তা করা এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
বিএসটিআই মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন, এফবিসিসিআই এর প্রশাসক মো. ফজলুল হক, বিএসটিআই পরিচালক (মান) মো. সাইদুল ইসলাম প্রমুখ।