বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটা, সামনে যেসব শর্ত

জাপানের কাছ থেকে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬৩৫ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই অর্থের পুরোটাই নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনশিল্প ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আলোচনা হলেও নতুন বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট অঙ্ক ঘোষণা করা হয়নি। ফলে জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে প্রকল্প চূড়ান্ত করা, বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে টোকিও পৌঁছান তারেক রহমান। সফরের প্রথম দিনেই দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট এবং জাপানের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

আলোচনায় শুধু ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা নয়, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নতুন শিল্প স্থাপনের বিষয়ও উঠে আসে। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাত নিয়ে আলোচনা আর বাস্তবে বিনিয়োগ আসা এক বিষয় নয়। নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন, বিনিয়োগের পরিমাণ ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসায় এখনই এর আর্থিক প্রভাব নির্ধারণের সুযোগ নেই।

বিনিয়োগের সম্ভাবনা যেসব খাতে

জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি এবং মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এসব খাতে বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বৈঠকে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়। নতুন সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে এ বিষয়ে বিনিয়োগের পরিমাণ, অর্থায়ন কাঠামো কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা এখনও জানানো হয়নি।

মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানো এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, বিনিয়োগের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারে কাজ চলছে।’

এর আগে গত ১১ অক্টোবর মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসায়ুকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ওই বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি, এআই, সাইবার নিরাপত্তা, সার ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।

ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় জোর

জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম জাইকা। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটি অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে।

সোমবার জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী চলমান বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জ্বালানি চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগের বছরের মতো বাজেট সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।

জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে বৈঠকে নতুন ঋণ বা সহায়তার কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি।

এখানে উন্নয়ন সহায়তা, ঋণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। জাইকার ঋণে কোনো অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেটিকে সরাসরি জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা যায় না। ফলে সফরের আলোচনার আর্থিক ফলাফল বুঝতে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থায়ন আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

৩২৮ কোটি ডলারের বাণিজ্য, রফতানিতে ওঠানামা

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩২৮ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। জাপান এখন বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রফতানি গন্তব্য।

বাংলাদেশ জাপানে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে। অন্যদিকে জাপান থেকে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস পণ্য, লোহা ও ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য আমদানি করা হয়। বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়লেও জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ছিল ১১৫ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১০৯ কোটি ডলারে নেমে আসে। পরের অর্থবছরে রফতানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১১৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১১৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানিতে জাপানের হিস্যা এ সময়ে বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর করা, বাণিজ্যপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো গেলে রফতানি ও বিনিয়োগ— দুই ক্ষেত্রেই নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইপিএ কার্যকর করা কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বাস্তব সুফল নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত, ব্যবসায়িক ব্যয়, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।

সফরের প্রথম দিনে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বাধীন জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সহযোগিতা চাওয়া হয়। একই বৈঠকে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী।

সম্ভাবনাকে বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার শর্ত

বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬৩৫ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জাপানের পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই অর্থ এখনও নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়। পরিকল্পনাটি বাস্তবে রূপ নেওয়া নির্ভর করবে নির্দিষ্ট প্রকল্প চূড়ান্ত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর।’

তিনি বলেন, ‘এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গাড়ি উৎপাদন, শিল্প, জ্বালানি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন কারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে শুধু নতুন পুঁজি ও আধুনিক প্রযুক্তিই আসবে না, বরং প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তর, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশেরও সুযোগ তৈরি হবে।’

ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, জাপানি বিনিয়োগ দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তৈরি পোশাকের বাইরেও রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার বৈশ্বিক প্রবণতা কাজে লাগিয়েও বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে।

তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে কয়েকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘বিনিয়োগবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতা, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন, উন্নত বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং চুক্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের কার্যকর সংযোগ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশগত মান বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব শর্ত পূরণ করা গেলে জাপানের সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং রফতানি সক্ষমতা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

সব মিলিয়ে জাপান সফরে বাংলাদেশের লক্ষ্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করা। তবে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আর বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। নতুন প্রকল্পের ঘোষণা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরই নির্ভর করবে জাপানের পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে।