মজুরি বোর্ড কীভাবে কাজ করে, কারা থাকেন এই বোর্ডে

দেশের বেসরকারি খাতের লাখ লাখ শ্রমিকের বেতন কত হবে, তার সর্বনিম্ন সীমা ঠিক করে দেয় নিম্নতম মজুরি বোর্ড। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই বোর্ড গঠিত হয়। অনেকের ধারণা, সরকার একাই মজুরি ঠিক করে দেয়। বাস্তবে তা নয়। মূলত এটি একটি ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া।

বোর্ডে কারা থাকেন?

স্থায়ীভাবে চারজন সদস্য থাকেন এই বোর্ডে— একজন চেয়ারম্যান (জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারক), একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিক প্রতিনিধি ও একজন শ্রমিক প্রতিনিধি।

যখন কোনো নির্দিষ্ট শিল্প, যেমন- তৈরি পোশাক শিল্পের মজুরি নির্ধারণ করতে হয়, তখন সরকার গেজেট দিয়ে ওই শিল্পের আরও দুজনকে যুক্ত করে— একজন মালিকপক্ষের, একজন শ্রমিকপক্ষের। তখনই এটি ৬ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ মজুরি বোর্ডে রূপ নেয়।

টানা বিক্ষোভ ও কারখানা বন্ধের মধ্যেই তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রবিবার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

কে কে আছেন বোর্ডে?

বিচারপতি শেখ আশফাকুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৬ সদস্যের এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন— নিরপেক্ষ সদস্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসলিউদ্দিন আহমেদ। মালিকপক্ষ (স্থায়ী): বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষ (স্থায়ী): বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন।  পোশাক খাতের মালিক প্রতিনিধি: বিজিএমইএ পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন। পোশাক খাতের শ্রমিক প্রতিনিধি: বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৬) এর ক্ষমতাবলে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কীভাবে কাজ শুরু হয়?

সরকার, মালিকপক্ষ বা শ্রমিকপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে কোনো শিল্পের মজুরি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়। আইন অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পরপর মজুরি সংশোধন করার বিধান রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৪৬টি সেক্টরের জন্য মজুরি বোর্ড কাজ করে।

গেজেট প্রকাশের পর চেয়ারম্যান সভা আহ্বান করেন এবং বোর্ড মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে।

মজুরি নির্ধারণে কী দেখা হয়?

বোর্ড ৫টি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়— ১. শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় ও জীবনমান। ২. দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থা। ৩. উৎপাদন খরচ ও উৎপাদনশীলতা। ৪. উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য। ৫. কাজের ধরন, ঝুঁকি ও দক্ষতা।

চূড়ান্ত হয় যেভাবে

বোর্ড প্রথমে একটি খসড়া সুপারিশ তৈরি করে গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এরপর ১৪ দিন সময় দেওয়া হয় সাধারণ মানুষ, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের আপত্তি বা পরামর্শ দেওয়ার জন্য। সেই আপত্তি পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠানো হয়। বোর্ড গঠনের নির্দেশ প্রাপ্তির ছয় মাসের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করতে হয়। সবশেষে শ্রম মন্ত্রণালয় গেজেট জারির মাধ্যমে চূড়ান্ত মজুরি ঘোষণা করে, যা কার্যকর করতে সব প্রতিষ্ঠান বাধ্য থাকে।

শ্রম আইনের ১৪০ ধারা অনুযায়ী, মজুরি বোর্ড সুপারিশ দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকার চাইলে ৪৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারে। বোর্ড পুনরায় পর্যালোচনা করে সংশোধিত সুপারিশ দিলে সরকার গেজেটের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত করে। গেজেট প্রকাশের দিন থেকেই তা কার্যকর হয় এবং এই হারই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে, যা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।