আজ নিজামীর রিভিউয়ের রায়

কারাগারের পথে প্রিজন ভ্যানের ভিতরে নিজামীএকাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া জামায়াতের আমির ও শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের রিভিউয়ে রায় আজ। দুই পক্ষের আপিলের রিভিউ শুনানি শেষে গত ৩ মে এ দিন নির্ধারণ করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এদিকে, শীর্ষ এই মানবতাবিরোধী অপরাধীর সর্বোচ্চ রায় শোনার প্রতীক্ষায় রয়েছে পুরোদেশ। 
দেশবাসীর এই অধীর প্রতীক্ষার মধ্যেই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চের আজকের কার্যতালিকায় রায় ঘোষণার জন্য রয়েছে। এ বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
এর আগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলেও নিজামীর ফাঁসি বহাল রাখা হয়। সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, ‘আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। আপিলকারী মতিউর রহমান নিজামীকে অভিযোগ নম্বর ১, ৩ ও ৪ থেকে খালাস দেওয়া হলো। অভিযোগ নম্বর ২, ৬, ৭, ৮ ও ১৬-এর ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড (মৃত্যুদণ্ড) বহাল রাখা হলো।’

আরও পড়তে পারেন: নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা রাজনৈতিক কারণে নয়!

আপিলের রায়ে ২, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পাবনার বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা ও ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ; পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা এবং পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী গণহত্যার দায়ে নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়েছে।

এরপর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে গত ২৯ শে মার্চ আইনজীবীদের মাধ্যমে আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন মতিউর রহমান নিজামী।

নিজামী হলেন, বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা তৃতীয় ব্যক্তি, একাত্তরের সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যার আজ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আর বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে এটি সর্বোচ্চ আদালতের দ্বিতীয় রায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৪ সালে এ মামলার রায়ে নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়ে রায়ে বলা হয়, আদালত সম্মত হয়েছেন যে, তিনি (নিজামী) যে মাত্রায় হত্যা, গণহত্যা ঘটিয়েছেন, তাতে সর্বোচ্চ সাজা না দিলে তা হবে ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা। জামায়াতের আজকের আমির নিজামী চার দশক আগে ছিলেন জামায়াতেরই ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নাজিমে আলা বা সভাপতি। সেই সূত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত আলবদর বাহিনীর প্রধান।

রায়ের  বিষয়ে আশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান,  আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলেই আশা করছেন তারা। অন্যদিকে নিজামীর আইনজীবীরা বলেন, যে সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে তাদের মক্কেল ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত হবেন। তিনি ‘খালাস’পাবেন। তারা বারবারই নিজামীর বয়সের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাবনায় হত্যা, ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী গণহত্যার দায়ে গতবছর ২৯ অক্টোবর নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে গত ২৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন নিজামী। ছয় হাজার ২৫২ পৃষ্ঠার নথিপত্রসহ নিজামীর করা আপিলে ১৬৮টি যুক্তি তুলে ধরে সাজার আদেশ বাতিল করে খালাস চাওয়া হয়। সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

আরও পড়তে পারেন: টুইটারে নিজামীর পক্ষে হ্যাশট্যাগ

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, আমরা চূড়ান্ত রায় শোনার অপেক্ষা করছি। রায় ঘোষণার পর তা কার্যকর করতে বেশি বিলম্ব করা যাবে না। কারণ জামায়াত ও এর দোসররা এই বিচার শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে রাখতে নীলনকশা করে চলেছে। তার বয়স বিবেচনায় নেওয়ার কথা বারবার বলা হয়। মনে রাখা দরকার, তিনি যখন এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন তিনি যুবক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এবং তার দল জামায়াত একই ধরনের অপরাধের মধ্য দিয়েই দেশকে নিতে চেয়েছেন।

উল্লেখ্য, গতবছর ৩০শে জানুয়ারি চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত৷ ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল গভীর রাতে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড বা সিইউএফএল জেটিঘাটে ধরা পড়ে ১০ ট্রাক অস্ত্র৷  এই অস্ত্র আটক মামলায় ৫০ জনকে আসামি করা হয়৷ নিজামী ঘটনার সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন৷

/এমএনএইচ/