সোমবার সারারাত গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কগ্রস্ত বাবা-মায়েরা বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রেখেছিলেন মঙ্গলবার সারাদিন। আশেপাশে বেশকিছু উৎসুক মানুষ এই গলিতে উপস্থিত থাকলেও তারা কেউই এসব বাড়ির নয়। খানিক দূর থেকে এসেছেন জানার জন্য এখানে আসলে রাতে কী ঘটেছিল।
জাহাজ বিল্ডিংয়ের ঠিক পাশের একতলা ভবনের টিনের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে পরিস্থিতি দেখছিল একজন কিশোরী। সামনে এগিয়ে গিয়ে একটু কথা বলব জানাতেই বললেন, আমরা কথা বলব না, কাল সারারাত যা হয়েছে, আবার যদি পুলিশ আমাদের কথা বলার জন্য ধরে? এ কথা বলেই দরজা বন্ধ করে দেন।
একটু পর দরজা খুলে, ওই কিশোরী বলেন, শুধু আপনি আসেন। পেশায় এক পার্লারকর্মী বলেন, আমি কোনও কথা বলব না, মাফ করবেন। বাসায় ঢুকে দেখা যায়, চারপাশ বন্ধ থাকায় সকাল নয়টাতেও আলো জ্বলছে অন্ধকার ঘরে। বিছানায় এক শিশু। কী হয়েছে জানতে চাইলে শিশুটির মা পেশায় গৃহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাল রাতে দৌড়ঝাঁপ, গোলাগুলির শব্দে ভোররাত থেকে বাচ্চাটার জ্বর। ছোট মানুষ ভয় পেয়েছে। আমরা বড়রাইতো এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।
ভয়ার্ত আরেক নারীর মুখ সামনে আসে। তিনি কথা না বলে উল্টোদিকে তার বরাদ্দ ঘরের দিকে রওনা দেন। ডাক দিতে বলেন, সারারাত ঘুমাইনি কেউ। এখন কী বলব। কিছুতো দেখিনি, কেবল আওয়াজ শুনছি। সবাইকে দরজা জানালা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এই গুলি কী দরজা লাগালেই কানে আসবে না। বরং কী ঘটছে কিছু বুঝতে না পেরে আতঙ্কিত হয়েছি।
বাড়ির পুরুষ সদস্য সকাল-সকাল অফিসে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাড়ির নারী সদস্য ভয়ার্ত চোখে মাঝে-মাঝে জানালার একটা পাল্লা খুলে বোঝার চেষ্টা করছেন কী হয়। ওই আধখোলা জানালা দিয়েই কথা হলো। তিনি বলেন, বাড়িতে বাজার নেই, সকাল থেকে বের হতে পারিনি। এমনভাবে কথা বললেন যেন যার সঙ্গে কথা বলছেন তাকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। পরিচয় দিতে তিনি বলেন, কে চোর, কে পুলিশ আর সাংবাদিক তার আমরা কী জানি? ছেলেটার জ্বর সকাল থেকে। বাসায় খাবার নেই। কাজের মেয়েকে আসতে দেয়নি পুলিশ, রাস্তা আটকে রেখেছে। আমাদের পাড়াতেই কেন এমন হতে হবে?
আপনি কী দেখেছেন—জানতে চাইলে বাড়িটির উল্টোদিকের অ্যাপার্টমেন্টের এক নারী বললেন, কিছু তো দেখিনি। কেবল শুনেছি। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ শুনেছি। আর যেন কী কী সব বলছিল। আমাদের বাসাটা একটু উল্টোদিকে হওয়ায় গুলির শব্দ পেলেও ভয় কম পেয়েছি। কিন্তু এরপর কী সেটা ভাবতেই ভয় লাগছে। পুলিশ কতদিন থাকে, আশেপাশের বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিনা। আমরা তো ভাই সকালে অফিসে যাই, রাতে ফিরি। পাশের বাসার মানুষকেও চিনি না। ফলে ভয়ে সিঁটিয়ে আছি।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে জাহাজ বিল্ডিংয়ে অভিযান চালানোর আগে পুলিশ আশেপাশের বেশ কয়েকটি মেসে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে। রাত ১২টার দিক থেকেই নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছিল। আমাদের এলাকা এত ভেতরে এখানে একটু শব্দই বড় করে শোনা যায়, বলছিলেন আরেক মধ্যবয়স্ক নারী। তিনি বলেন, তার নাতি এত ভয় পেয়েছে যে, সকাল থেকেই কান্না থামছে না। তার মা কোনওভাবেই মেয়েকে বুঝাতে পারছেন না।
উল্লেখ্য, রাজধানীর কল্যাণপুরে ওই ৫ তলা ভবনে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে। অপারেশন স্টর্ম-২৬ নামে চালানো এক ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে ভবনে থাকা ৯ জঙ্গি মারা যায় পুলিশের গুলিতে। জঙ্গিরা নিহত হওয়ার পর পুলিশ অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছে।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম
আরও পড়তে পারেন:
পুলিশের ওপর হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
জঙ্গিদের গায়ে ছিলো কালো পোশাক, হাতে ছিল ছোরা: আইজিপি
/ইউআই/এমএসএম/এমএনএইচ/