রিজার্ভ চুরির ঘটনায় প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযুক্ত কর্মকর্তারা তথ্যগত ত্রুটির কারণে যাতে আদালতে গিয়ে বের হয়ে না যেতে পারেন, সেজন্য তাদের বিষয়ে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত সন্তোষজনক পর্যায়ে আসলেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানিয়েছেন। শনিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সিআইডির এই কর্মকর্তা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ১২০ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। এদের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এরা মূলত রিজার্ভ চুরির প্লট তৈরি করেছেন। কেউ সার্ভার রুম খোলা রেখে, কেউ নেট সংযোগ দিয়ে এবং কেউবা অনুপস্থিত থেকে হ্যাকারদের সহযোগিতা করেছেন। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ফরেন রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দুইজন, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের চারজন, আইটি অপারেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের চারজন, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের চারজন এবং ব্যাংক অফিস অব দ্য ডিলিংস রুমের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে তাদের বিষয়ে আরও নির্ভুল তথ্য হাতে পাওয়ার পরই গ্রেফতার করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। কর্মকর্তারা বলছেন, তা না হলে অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যেতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের বিষয়ে সিআইডির কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ‘আমরা শিগগিরই একটি আপডেট দেবো। তবে এনিয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু বলা যাচ্ছে না। প্রস্তুতি নিতে কিছু সময় লাগছে। আমাদের সঙ্গে ফরেন কাউন্টার পার্ট রয়েছে। তারা যদি তথ্য দিতে দেরি করে, তাহলে আমাদের কী-ইবা করার আছে। এ জন্য সময় লাগছে।’
অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন প্রশ্নে শাহ আলম বলেন, ‘গ্রেফতার করা হচ্ছে না ব্যাপারটা তা না। আমাদের সন্তোষজনক জায়গাটা কোন লেবেলে আছে, সেটার বিষয়। তদন্তের পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যদি ট্রায়েলে চলে যায়, তখন আইনজীবীরা ছোট ও তুচ্ছ বিষয়গুলোও তাদের পক্ষে ব্যবহার করে। তারা প্রমাণ করে যে এতটুকুই যথেষ্ট না। সেদিক থেকে আমাদের সন্তোষজনক জায়গাটায় এখনও ঘাটতি আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ শুধু গ্রেফতার করলেই যে তদন্ত এগিয়ে যাবে, বিষয়টা তা নয়। সন্তোষজনক পর্যায়ে আসলেই আমরা অভিযুক্তদের গ্রেফতার করবো।’
সিআইডি সূত্র জানায়, ফিলিপাইনে অর্থ চুরির ঘটনা ধরা পড়ার তিন সপ্তাহ পরে সেখানে একটি ফৌজদারি মামলা হয়। ফিলিপাইন পুলিশ সেটি তদন্ত করছে। তাদের সঙ্গে সিআইডি যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সেদেশের নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ চেয়ে চিঠি দিয়েছে সিআইডি। তবে চিঠির কোনও সাড়া মেলেনি এখনও। কবে নাগাদ ফিলিপাইনের জড়িত ওই ব্যক্তিদের সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। একই ঘটনা ঘটেছে শ্রীলঙ্কানদের ক্ষেত্রেও। ২০ বিদেশির মধ্যে শ্রীলঙ্কার সাত নাগরিক এবং সাসাকি নামে এক জাপানির সম্পৃক্ততা পেয়েছে সিআইডি । শ্রীলঙ্কার সাত নাগরিকের মধ্যে সেখানকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শালিকা ফাউন্ডেশনের ছয় পরিচালক রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ২০ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়। পরে তা জমা হয় শালিকা ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টে। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত শ্রীলঙ্কানদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি সিআইডির তদন্ত দল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সিআইডির দু’টি তদন্ত দল সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইন ঘুরে আসে। কিন্তু দেশ দুটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সিআইডির তদন্ত দলের মুখোমুখি করেনি।
সিআইডি কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ‘এই মামলার সঙ্গে আরও কাউন্টার পার্ট রয়েছে। এর সঙ্গে ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ জড়িত। ফিলিপাইনে যারা ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলেছে, তাদের নির্দেশদাতা কে ছিল,সেদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ বের করবে। তারা কতটুকু বের করতে সক্ষম হয়েছে, তা এখনও আমরা জানতে পারিনি। তবে আমাদের এ উপমহাদেশের সব রাষ্ট্র এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে।’
তিনি বলেন, ‘আসলে ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম তদন্ত করতে নির্দিষ্ট কোনও সময় বেঁধে দেওয়া যায় না। তারপরও আমাদের ভালোই অগ্রগতি রয়েছে।’
অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের দেশত্যাগের চেষ্টার বিষয়ে শাহ আলম বলেন, ‘আমি এই বিষয়টা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে নেয় হ্যাকাররা। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ৮১ মিলিয়ন ডলার চলে যায় ফিলিপাইনে। ওই অর্থের দেড় কোটি (১৫ মিলিয়ন) ডলার ফেরত দিয়েছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই অর্থ জুয়ার টেবিলে চলে গিয়েছিল। এক ক্যাসিনো মালিক তদন্তের চাপে পড়ে তা ফেরত দেয়। এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।
/এআরআর/ এপিএইচ/আপ-টিএন/