কনস্টেবল লুৎফার জীবনচাকার সাইকেল

লুৎফা বেগমরাজধানীতে সাইকেলে চড়ে যাতায়াত করেন এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কেউ স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে, কেউ সখের বশে, আবার কেউবা কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য সাইকেল ব্যবহার করেন। কিন্তু পুলিশ কনস্টেবল লুৎফা বেগমের গল্পটা একটু ভিন্নধর্মী। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এই নারী কনস্টেবল রাজারবাগ থেকে প্রতিদিন সাইকেলে চড়েই থানায় আসা-যাওয়া করেন। যানজটের এই শহরে অনেকটা স্বাচ্ছন্দে ও সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতেই দুই চাকার সাইকেলটি ব্যবহার করেন তিনি।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোশতাক আহমেদ তার ফেসবুক ওয়ালে লুৎফা বেগমের কর্মস্থলে যাওয়ার একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিটিতে দেখা যায়, কাঁধে ব্যাগ, মাথায় হেলমেট, হ্যান্ডগ্লাবস পড়ে সাইকেল চালাচ্ছেন লুৎফা। ফেসবুক পোস্টে লুৎফার এই পরিবর্তনে বিস্মিত ও নিজে অভিভূত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন মোশতাক আহমেদ। এই সংগ্রামী পুলিশের সহকর্মী হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করেন তিনি। তার এই ফেসবুক পোস্টের পর ছবিটি ভাইরাল হয়।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।লুৎফা বেগম প্রশংসা ও সাধুবাদ পেতে থাকেন সর্বস্তর থেকে।

বুধবার সন্ধ্যায় লুৎফা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান তার জীবনযুদ্ধের গল্প।লুৎফার জন্ম সিলেটের বালাগঞ্জ থানায়। কৃষক পরিবারের মেয়ে তিনি। সাত ভাইবোনের মধ্যে তারা অবস্থান ষষ্ঠ। ২০০৪ সালে সিলেটের বোয়ালপুর বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর ২০০৬ সালে বালাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা পাশ করেন লুত্ফা। এসএসসি পাশের আগে থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়াশুনার খরচ চালাতেন নিজেই।তবে এইচএসসি পাশের পর অভাব দূর করতে উপার্জন করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় লুৎফা মনে।আর তখনই ২০০৭ সালে পুলিশে ভর্তির সুযোগ আসে।

লুৎফা জানান, পুলিশে ভর্তিতে কোনও সহযোগিতা পাচ্ছিলেন না তিনি। গ্রামের মেয়ে পুলিশে চাকরি করবে,এটা পরিবারসহ এলাকার লোক কেউ চায়নি।শুধু নিজের ইচ্ছা আর বড় ভাইয়ের সাপোর্টে আবেদন করেন পুলিশে। এবং কৃতিত্বের সঙ্গে সকল পরীক্ষায় পাশ করে ভর্তি হন বাংলাদেশ পুলিশে। এভাবেই শুরুটা করেছিলেন ২০০৮ সালের ৪ মে। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তার কর্মস্থল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা। বসবাস করেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের মহিলা হোস্টেলে। আর সেখান থেকে প্রতিদিন কর্মস্থলে আসেন সাইকেলে চড়ে।

সাইকেল চালিয়ে যাতায়াতের কারণ হিসেবে লুৎফা বেগম বলেন, ‘এর পেছনে অন্য কোনও কারণ নেই। রাস্তার জ্যাম ও সময় বাঁচাতে সাইকেলে চলাচল করি।’ সাইকেলে চড়ার কারণে সময়মতো অফিস করতে পারছেন বলেও জানান তিনি।

সেই ছোটবেলায় চালানো শিখলেও ঢাকার রাস্তায় সাইকেল চালাবেন এমনটি কখনও ভাবেননি লুৎফা। তবে রাস্তার জ্যাম ও সময় মতো অফিসে পৌঁছানোর তাড়না থেকে তিনি সাইকেল কিনেন বছর দেড়েক আগে। ঢাকার রাস্তায় স্কুটি চালিয়ে চলাফেরা করার ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতা বা অভাবের কারণে সাইকেলই বেছে নিয়েছেন তিনি।

লুৎফা বলেন, ‘ছোটবেলাতেই সাইকেল চালানো শিখেছি। গ্রামে মাঝে মাঝে চালাতাম।কিন্তু ঢাকায় চালাবো এমনটি ভাবিনি। ইচ্ছে ছিল স্কুটি চালাবো।কিন্তু এত টাকা দিয়ে স্কুটি কেনার সামর্থ্য না থাকায় সাইকেল কিনেই রাস্তায় নেমেছি। শুরুতে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন রাস্তায় চলতে কোনও সমস্যা হয় না।’ 

শুধু সাইকেল চালানো নয়, নারীদের সকল কাজে সমাজের সবার সহযোগিতা কামনা করেন পুলিশ কনস্টেবল লুৎফা বেগম। তিনি মনে করেন, নারীদের অগ্রযাত্রা আরও সহজ ‍ও সুন্দর করার জন্য সমাজ ও পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। বাড়িয়ে দিতে হবে সহযোগিতার হাত। আর তাহলেই দেশ ও জাতির উন্নয়নে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে বাংলাদেশের নারীরা।

/আরজে/এপিএইচ/