দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ১৫ হাজার শিক্ষানবিশ আইনজীবীর
গত বছর এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা স্থগিত রেখে হাইকোর্ট রায় দেওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপীল করে। অধিকারবঞ্চিত শিক্ষানবিশ আইনজীবী ফোরামের সদস্যরা এ তথ্য জানিয়েছেন। ফোরামের আহ্বায়ক রাম চন্দ্র দাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালতে রায় ঘোষণার সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কোনও আইনজীবী ছিলেন না। একতরফা রায় ঘোষণা করা হয়েছে। তাই রায়টি আইনগতভাবে যৌক্তিকতা হারায়।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যুক্তিহীনভাবে একতরফা তাদের পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা এসেছে। তাই হাইকোর্টের কাছে ‘যৌক্তিক’ সমাধান আশা করছেন তারা। তবু তাদের আশঙ্কা কাটছে না। এর কারণ জানিয়ে ফোরামের আহ্বায়ক বাংলা ট্রিবিউনকে আরও বলেন,‘যেহেতু আমাদের দাবি যৌক্তিক তাই আপীল করার পর আমরা শিক্ষানবীশ কার্যক্রম অর্থাৎ আইনজীবী হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আদালতের মাধ্যমে জানতে পেরেছি আমাদের আপীলটি হয়তো খারিজ হয়ে যাবে। আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হবে না।’
জানা যায়, ২০১৩ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা দুই বছর মেয়াদী এলএলবি শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট অন্তর্ভুক্তি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়। পরের বছর দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই মেয়াদে এলএলবি (পাস) কোর্স ডিগ্রিধারীদেরও ক্ষেত্রেও একই ঘোষণা আসে।
২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট দারুল ইহসানসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা দুই বছর মেয়াদী এলএলবি শিক্ষার্থীরা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না বলে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (বিবিসি) পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মেধাতালিকা তৈরি করে দেবে। ওই মেধাতালিকা অনুসারেই শিক্ষার্থী ভর্তি করবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
কিন্তু বার কাউন্সিলের নোটিশ জারি ও হাইকোর্টের রায় ঘোষণার আগের শিক্ষার্থীদের দাবি, এই সময়ের আগে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আইনসঙ্গত নয়। এছাড়া স্বাধীনভাবে পেশা গ্রহণের অধিকারকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে বলে মন্তব্য তাদের।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক রাম চন্দ্র দাশ বলেন, ‘আমরা ১৫ হাজার শিক্ষার্থী কয়েক বছর ধরে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করছি। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন জানেন আমরা আইনজীবী হবো। কিন্তু এখন পেশার অধিকার কেড়ে নিলে আমাদের আর বিকল্প কোনও পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।’
সংগঠনের যুগ্ম-আহবায়ক কামরুজ্জামান ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অনুমোদনপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২’-এ আর্টিকেল ২৭ (১) অনুযায়ী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের এই নাজুক পরিস্থিতিতে কেন ঠেলে দেওয়া হচ্ছে জানি না। তাছাড়া মঞ্জুরি কমিশন এখনও তাদের আইন পরিবর্তন করেনি। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত নিতে গেলেও তো আইন মেনেই নিতে হবে।”
কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আরও জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। অথচ উভয়ের যোগ্যতা সমান। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদের ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’র মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে গত বছর হাইকোর্ট রায়ে আইনজীবী পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ বছর বয়সও নির্ধারণ করে দিয়েছে। বয়স নির্ধারণের এমন ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষানবীশ আইনজীবী হেলাল-ই-আজম মনে করেন, আইনজীবী পেশায় যে কোনও বয়সে প্রবেশ করার সুযোগ থাকা উচিত। পাশের দেশ ভারতেও এ নিয়ম রয়েছে বলে মন্তব্য তার।
এ প্রসঙ্গে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে এত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে, সেখানে লেখাপড়ার মান খুব একটা ভালো না। এ কারণে সেখান থেকে যারা আসেন তাদের অনেকেই আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। ফলে এসবের লাগাম টেনে ধরা উচিত।’
কিন্তু রায় ঘোষণা ও রেজিস্ট্রেশন স্থগিতের ঘোষণার আগের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বসতে পারবে কিনা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘রায়টিতে কি ঘোষণা হয়েছে সেটা দেখতে হবে। তবে তারা সমস্যার কথা আমাদের জানাননি।’
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল, বার কাউন্সিলের সভাপতি, সহ-সভাপতি, অ্যাডভোকেট বাসেত মজুমদার ও আইনমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে ফোরাম। অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি তাদের সঙ্গে দেখা করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে তার।
প্রসঙ্গত, বুধবার (১৫ মার্চ) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ছোট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে শিক্ষানবীশ আইনজীবী ফোরাম। আগামী ১৮ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করবেন তারা।
/আরএআর/জেএইচ/